মতামত
সামরিক শাসন বনাম উন্নয়ন: পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রেক্ষিত

সত্যদর্শী চাকমা
সবাই এক বাক্যে স্বীকার করবেন সামরিক শাসন দেশের উন্নতি, সমৃদ্ধি ও প্রগতির পথে সব সময় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এজন্য দেশে দেশে জনগণ গণতন্ত্রের জন্য সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রাম করে থাকে। বাংলাদেশের জনগণেরও সামরিক শাসন ও তার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দীর্ঘ ও তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে।
বাংলাদেশে সামরিক শাসন এসেছে কখনও প্রত্যক্ষ সামরিক আইন জারীর মাধ্যমে, কখনও বেসামরিক পোষক-পরা সেনানায়কদের স্বৈরাচারী শাসনের মাধ্যমে, আবার কখনও সেনা-সমর্থিত বেসামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে। তবে সামরিক শাসন যে রূপেই বা যে লেবাসেই আসুক, তা গণতন্ত্র ও উন্নয়নের জন্য অভিশাপই হয়েছে। সে কারণে জনগণ তার বিরোধীতা করে।
এখন প্রশ্ন হলো, যদি সামরিক শাসন উন্নয়ন ও সমাজ প্রগতির পথে বাধা হয়ে থাকে, তাহলে কেন পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি ও সামরিক শাসন-নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে? এটা কি স্ববিরোধীতা নয়? দেশের একটি অঞ্চলে সামরিক শাসন জারী রেখে বাদবাকি অঞ্চলে প্রকৃত গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠা ও উন্নতি কি আদৌ সম্ভব? এটা যে সম্ভব নয় তার সাক্ষী বাংলাদেশের গত ৫৫ বছরের ইতিহাস।
পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাশাসন কেবল এই অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য বাধা নয়, তা সমগ্র দেশের উন্নয়নের জন্যও বাধা। শরীরের দূরবর্তী কোন অংশে যেমন হাতে বা পায়ে যদি রক্ত প্রবাহের মাধ্যমে অক্সিজেন সরবরাহ না হয় বা কম হয়, তাহলে সেখানে অবধারিতভাবে গ্যাংগ্রিন, আলসার ও ক্যান্সার হবে এবং এতে আক্রান্ত ব্যক্তির নিশ্চিত মৃত্যু ঘটবে। অথবা তাকে রক্ষা করতে তার হাত বা পা কেটে বাদ দিতে হবে। কাজেই পার্বত্য চট্টগ্রামে যদি গণতন্ত্র নামক অক্সিজেন না পৌঁছায়, তাহলে দীর্ঘ সময় পর তার পরিণতি ভালো হবে না।
পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনা উপস্থিতির পক্ষে একটি যুক্তি দেওয়া হয় যে, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য সেখানে সেনাবাহিনী থাকা প্রয়োজন। পাহাড়ে অবশ্যই সেনা উপস্থিতি থাকতে পারে, যেভাবে বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলে রয়েছে। কিন্তু জনজীবনের ওপর সেনা নিয়ন্ত্রণ কেন থাকবে? কেন সেনাশাসন থাকবে? কেন পুরো এলাকা সেনা ছাউনিতে ছেয়ে ফেলা হবে – যেন এখনই বাইরের কোন দেশ বা শত্রু আমাদের আক্রমণ করে বসবে? কেন সব সময় বেছে বেছে পাহাড়ি গ্রামগুলোতে সেনা অপারেশন, ঘরবাড়ি তল্লাশি ও হয়রনি করা হবে? সেনা উপস্থিতি আর সেনাশাসন এক জিনিস নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ সেনা উপস্থিতির বিরোধীতা করে না, সেনাশাসনের, সেনানিয়ন্ত্রণের বিরোধীতা করে। এবং সেটা করে অত্যন্ত সঙ্গত ও যৌক্তিক কারণে।
আমরা জানি, উপরের প্রশ্নগুলোর উত্তরে সেনাদের বা তাদের বশংবদদের পক্ষ থেকে বলা হবে: সন্ত্রাস দমনের জন্য এটা করা প্রয়োজন হয়। কিন্তু তাদের এই ব্যাখ্যা যে পুরোপুরি ভাওতাবাজি ও বিভ্রান্তিকর তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনায় গেলে লেখা অনেক দীর্ঘ হবে। এখানে শুধু এটা বলা যথেষ্ট হবে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্তমানে সকল সমস্যার মূলে রয়েছে গণতান্ত্রিক পরিবেশের অনুপস্থিতি এবং নিরঙ্কুশ সামরিক শাসন। এমনকি ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির মাধ্যমে সশস্ত্র সংগ্রাম শেষ হয়ে যাওয়ার পরও এই একই অবস্থা এখনও বিরাজমান রয়েছে। এখনও পার্বত্য চট্টগ্রামকে কাউন্টার-ইন্সার্জেন্সির লেন্স দিয়ে দেখা হচ্ছে। সেনাবাহিনীই এখনও এখানে একচ্ছত্র অধিপতি।
সাজেকে কলেজ প্রতিষ্ঠাকেও তারা এই তথাকথিত কাউন্টার-ইন্সার্জেন্সির দৃষ্টিকোণ থেকেই বিচার করছে। তারা মনে করে কলেজে সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ না থাকলে সেখানে পাহাড়ি রাজনৈতিক দলগুলোর এবং আরো খোলাসা করে বললে ইউপিডিএফের আধিপত্য কায়েম হবে। সাজেকের শিক্ষিত ছাত্র-যুব সমাজ রাজনৈতিকভাবে সচেতন হবে এবং সেটা সেনাবাহিনীর জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
আসলে এটা সেনাবাহিনীর একটি বিভ্রম মাত্র। তারা রজ্জুকে সর্প মনে করছে এবং তিলকে তাল বানাচ্ছে। তারা পুরো বিষয়টিকে উল্টো করে দেখছে। রিপ ভ্যান উইঙ্কুলের (Rip Van Winkle) গল্পের নায়কটির মতো তাদের চিন্তা চেতনা এখনও সুদূর অতীতে পড়ে আছে, অথচ দেশ সমাজ দুনিয়া অনেক এগিয়ে গেছে।
মূল কথা হলো, সামরিক দমনপীড়নের মাধ্যমে কোন অঞ্চলে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। বাংলাদেশে ৭১-পূর্ব সময়কালে পশ্চিম পাকিস্তানীদের উগ্র সামরিক বলপ্রয়োগ তার প্রমাণ। আপনি যতই সামরিকভাবে কোন অঞ্চলের জনগণের ন্যায্য অধিকারকে দমন করতে চাইবেন, তাদের গণতন্ত্র ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং প্রচেষ্টা ততই বাড়তে থাকবে। সামরিকভাবে কখনই গণতন্ত্র, প্রগতি ও মুক্তি ঠেকানো যায় না। সাজেকে কলেজ চালু করাকে কি সেনাবাহিনী বলপ্রয়োগ করে ঠেকাতে পারছে? যখন জনগণের আর পেছনে যাওয়ার জায়গা থাকে না, তখন তারা বাঁচার জন্য মরিয়া হয়ে লড়াই করতে বাধ্য হয়। আর যখনই তারা এক হয়ে লড়াই করে তখন তা কোনভাবে দমন করা যায় না। ইতিহাসে এই সত্য বার বার প্রমাণিত হয়েছে।
শুরুর কথা শেষে আর একবার বললে, পার্বত্য চট্টগ্রামে, এমনকি সারা দেশে উন্নয়নের পথে বাধা হলো পার্বত্য চট্টগ্রামে বিরাজমান সামরিক শাসন। যতদিন পাহাড়ে সামরিক শাসন থাকবে, ততদিন পাহাড়ে তো বটে, বাংলাদেশে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়ন সম্ভব হবে না।
“যাহারা নিচে রহিয়াছে তাহারা যখন আমাদের টানিবে, তখন আমরাও নিচে নামিয়া যাইব। যাহাদের আমরা পেছনে ফেলিয়া রাখিব, তাহারা আমাদের সম্মুখের গতিকে রুদ্ধ করিবে।” – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই উক্তিটি দেশের কর্ণধারগণ মনে রাখলে সবার জন্য মঙ্গল হবে। (১১ আগস্ট ২০২৬)
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
