হিল উইমেন্স ফেডারেশন যে কারণে বিশেষ নারী সম্মেলনের মাধ্যমে ৭ দফা রাজনৈতিক প্রস্তাবনা তুলে ধরেছে

নিজস্ব প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হিল উইমেন্স ফেডারেশন আজ রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়া এলাকায় এক বিশেষ নারী সম্মেলনের মাধ্যমে ৭ দফা রাজনৈতিক প্রস্তাবনা তুলে ধরেছে। সম্মেলনে উপস্থিতি প্রতিনিধি-পর্যবেক্ষকরা করতালির মাধ্যমে প্রস্তাবনাটি গ্রহণ করেন।
প্রস্তাবনার প্রারম্ভে বলা হয়েছে, “পাহাড়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে প্রথম শহীদ ভরদ্বাজ মুনি’র রক্তস্নাত পূণ্যভূমি মাইনি উপত্যকায় হিল উইমেন্স ফেডারেশনের ‘বিশেষ সম্মেলন’ এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যার ক’দিন আগে ১০ সেপ্টেম্বর রাতে প্রজ্ঞাপন জারি করে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের “সন্ত্রাস ও বিচ্ছিন্নতাবাদ দমন, সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং প্রচলিত আইন, পার্বত্য চুক্তির শর্ত ও বিধি-বিধান পর্যালোচনা” করে “জাতীয় কর্মকৌশল” নির্ধারণের লক্ষ্যে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তিনটি কমিটি করেছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে এ কমিটি কর্তৃক পার্বত্য চট্টগ্রামের ব্যাপারে কর্মকৌশল চূড়ান্ত করার কথা রয়েছে।”
এতে বলা হয়, “হিল উইমেন্স ফেডারেশনের বিশেষ সম্মেলন তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের এ ধরনের পদক্ষেপে পাহাড়ে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা তথা সংখ্যালঘু জাতিসত্তাসমূহের ভবিষ্যত অস্তিত্ব নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারে না। নারীসমাজ গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার সাথে সরকারের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবে।
“হিল উইমেন্স ফেডারেশনের বিশেষ সম্মেলন মনে করে, পাহাড়ে নারী নিরাপত্তার প্রধান হুমকি হচ্ছে সেনা ও সেটলার। পার্বত্য অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পূর্ব শর্ত হচ্ছে পাহাড় থেকে “অপারেশন উত্তরণ” ও “অবৈধ ১১দফা নির্দেশনা” প্রত্যাহার করে সেনা-সেটলার ফিরিয়ে নেওয়া। তার পরিবর্তে সেনা, গোয়েন্দা, আমলা ও সরকারের অনুগ্রহভাজন কতিপয় ব্যক্তিবিশেষের ওপর নির্ভর করে সরকার কর্মকৌশল প্রণয়ন করতে উদ্যত হয়েছে, তা গণতন্ত্রের প্রতি বিএনপি’র অঙ্গীকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সেনা ও আমলা নির্ভর উদ্যোগ ফলপ্রসু হবে না বলে নারী সম্মেলন মনে করে।”
প্রস্তাবনায় বলা হয়, “নারী সম্মেলন দ্ব্যর্থহীনভাবে জানিয়ে দিতে চায় যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা হচ্ছে রাজনৈতিক সমস্যা। রাজনৈতিকভাবে এ সমস্যার সমাধান করতে হবে। “সন্ত্রাস” ও “বিচ্ছিন্নতাবাদ দমন”, “সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ”—ইত্যাদি পরিভাষা ব্যবহার হচ্ছে প্রকৃত সমস্যা আড়াল করার লক্ষ্যে গণবিরোধী স্বৈরশাসকের চিরচেনা কৌশল। তাতে সমস্যা জটিল থেকে জটিলতর হবে বলে নারী সম্মেলন মনে করে।
“নারী সম্মেলন এটাও স্মরণ করিয়ে দিতে চায়, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামীলীগ সরকার রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে ‘পার্বত্য চুক্তি’ সম্পাদন করলেও তাতে মৌলিক গলদ থাকায় পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সমাধান হয়নি। বর্তমানে চুক্তিটি অকার্যকর। চাকমা ভাষায় যা ‘ব-যিয়ে চুক্তি’ বলে আখ্যায়িত করা যায়। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত বিএনপি সরকারের সম্মুখে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের ঐতিহাসিক সুযোগ হাজির হলেও রাষ্ট্রনায়কোচিত দূরদর্শীতার অভাবে তা হাতছাড়া হতে চলেছে বলে নারী সম্মেলন আশঙ্কা করছে।”
এতে আরো বলা হয়, “হিল উইমেন্স ফেডারেশনের নারী সম্মেলন এটাও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিতে চায় যে, বল প্রয়োগ করে অর্থাৎ সামরিকভাবে দমন-পীড়ন চালিয়ে কোথাও জনগণের সংগ্রামকে পর্যদুস্ত করা যায়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের ন্যায্য সংগ্রামকেও বন্দুক বেয়নেট দিয়ে গুড়িয়ে দেওয়া যাবে না।
আওয়ামীলীগের শাসনামলে পাহাড়িদের মধ্য থেকে একটি অংশকে বাগিয়ে নিয়ে ক্ষমতায় অংশীদার করায় বিভাজন সৃষ্টি করা গেলেও জনগণের অধিকার আন্দোলন ধ্বংস করা যায়নি।”
প্রস্তাবনায় বলা হয়, “হিল উইমেন্স ফেডারেশনের বিশেষ সম্মেলন পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারা দেশে নারী ও শিশু নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে লড়াই সংগ্রাম সংগঠিত করছে এবং এ লড়াই চালিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর।
“মেইনি উপত্যকায় আহূত এই ঐতিহাসিক নারী সম্মেলন এটাও স্পষ্ট করতে চায় যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতা হচ্ছে পাহাড়ি জাতিসত্তাসমূহের রাজনৈতিক অধিকার অর্জিত হলে তবেই নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বাস্তব শর্ত তৈরি হবে।”
এই পরিস্থিতিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি ও সমাধানের লক্ষ্যে সম্মেলনে নিম্নের ৭ দফা প্রস্তাবনা গ্রহণ করা হয়।
প্রস্তাবনাগুলো হলো:
১. পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে কাল বিলম্ব না করে জনগণের একমাত্র দাবি পূর্ণস্বায়ত্তশাসন মেনে নেওয়া হোক। এ দাবিতে আন্দোলনরত ইউপিডিএফ-এর সাথে আনুষ্ঠানিক সংলাপের সরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক।
২.০ অনতিবিলম্বে ফ্যাসিবাদী শাসনামলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়েরকৃত ষড়যন্ত্রমূলক সকল মিথ্যা-মামলা-হুলিয়া নিঃশর্তে প্রত্যাহার করা হোক।
২.১ জেলে অন্তরীণ ইউপিডিএফ নেতা আনন্দ প্রকাশ চাকমা সহ সকল রাজবন্দী ও বান্দরবানের বম জাতিসত্তার লোকদের নিঃশর্তে মুক্তি দেওয়া হোক।
২.২ বিভিন্ন অপরাধে লিপ্ত সেনা মদদপুষ্ট সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
২.৩ নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক নির্বিচারে ধরপাকড়, হয়রানি ও টহল বন্ধ করা হোক।
৩. দেশের নাগরিক হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িদের সংবিধান স্বীকৃত শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ করার অধিকার দেওয়া হোক।
৪. নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঢাকায় শিশু রামিসার ধর্ষক-খুনীর বিরুদ্ধে গৃহীত আইনী ব্যবস্থা পার্বত্য চট্টগ্রামেও অনুসরণ করা হোক।
৫. পাহাড়ে আইনের শাসনের প্রতি জনগণের আস্থা স্থাপন করতে বহুল আলোচিত কল্পনা চাকমার চিহ্নিত অপহরণকারী লে. ফেরদৌস গংদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক সাজা প্রদান করা হোক।
৬. ২০২৪ সালের ১৯-২০ সেপ্টেম্বর দীঘিনালা-খাগড়াছড়ি-রাঙ্গামাটি ও ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালে গুইমারায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, ধ্বংসযজ্ঞ ও লুটপাটের তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা প্রদান নিশ্চিত করা হোক। বিভিন্ন সময়ে পাহাড়ে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার করা হোক।
৭. বন-প্রকৃতি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র রক্ষার্থে অনতিবিলম্বে পাহাড় কাটা, সীমান্ত সড়ক নির্মাণ বন্ধ করে বিদেশী প্রজাতির গাছ রোপনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হোক।
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
