খাগড়াছড়ি শহরে পাহাড়িদের ওপর হামলা : এক বছরেও জড়িত সেটলারদের গ্রেফতার ও বিচার করা হয়নি

0
সেটলারদের হামলায় গুরুতর আহত ৪ জন। ফাইল ছবি


খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ

রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

খাগড়াছড়ি সদরের সিঙ্গিনালায় মারমা কিশোরী ধর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে জুম্ম ছাত্র জনতার ডাকে সড়ক অবরোধ চলাকালে ২০২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি শহরের তিন স্থানে সেটলার বাঙালিরা পাহাড়িদের ওপর হামলা চালায়। এ হামলায় কয়েকজন পাহাড়ি আহত হন এবং সেটলাররা দোকানপাটেও আক্রমণ ও ভাঙচুর চালায়।

চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী গঠিত ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এটি ছিল ৫ম দফায় পাহাড়িদের ওপর হামলার ঘটনা। 

এক বছরেও এ হামলার ঘটনায় জড়িত সেটলারদের গ্রেফতার ও বিচার করা হয়নি।

ঘটনার প্রেক্ষাপট

২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ রাতে সিঙ্গিনালায় ৮ম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক মারমা কিশোরীকে তিন বাঙালি যুবক কর্তৃক দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা জানাজানি হলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবিতে ‘জুম্ম ছাত্র জনতা’ নামে একটি প্লাটফর্ম থেকে পরদিন (২৪ সেপ্টেম্বর) খাগড়াছড়ি সদরের মুক্তমঞ্চে সমাবেশের আহ্বান করা হয়। অপরদিকে, সেনাবাহিনী ও পুলিশ ঘটনার পরদিন সিঙ্গিনালা থেকে চয়ন শীল নামে এক যুবককে ঘটনার অভিযুক্ত হিসেবে আটক করে।

মুক্তমঞ্চের সমাবেশ থেকে ‘জুম্ম ছাত্র জনতা’র নেতৃবৃন্দ ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত সকল অপরাধীকে গ্রেফতার ও যথাযথ বিচারের দাবিতে ২৫ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি জেলায় আধাবেলা সড়ক অবরোধ ও ২৬ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি শহরে যৌন নিপীড়ন বিরোধী মহাসমাবেশের ঘোষণা দেয়।

তাদের ঘোষিত কর্মসূচি মোতাবেক ২৫ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি জেলাব্যাপী শান্তিপূর্ণ ও স্বতঃস্ফুর্তভাবে আধাবেলা সড়ক অবরোধ পালিত হয়। কিন্তু আন্দোলন বানচাল করে দেয়ার লক্ষ্যে সেদিন রাত সাড়ে ৮টার সময় খাগড়াছড়ি সদরের মধুপুর বাজার এলাকা থেকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা জুম্ম ছাত্র জনতার অন্যতম সংগঠক ও বাংলাদেশ মারমা স্টুডেন্টস কাউন্সিলের খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক উক্যনু মারমাকে জোরপূর্বক টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে তুলে শারীরিক নির্যাতন-হেনস্তা করে এবং তাঁকে খাগড়াছড়ি ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়।

এ ঘটনা জানাজানি হলে উক্যনু মারমাকে আটকের প্রতিবাদে পানখাইয়া পাড়া, সিঙ্গিনালাসহ বিভিন্ন এলাকায় শত শত লোকজন রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। ফলে রাত ১০টার দিকে সেনাবাহিনী খাগড়াছড়ি ক্যান্টনমেন্ট থেকে উক্যনু মারমাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। মুক্তি পাওয়ার পর পরই লোকজন পানখাইয়া পাড়ায় ছুটে যায়। সেখানে বিক্ষুব্ধ জনতার সামনে উক্যনু মারমা বক্তব্য দেন এবং পরদিন (২৬ সেপ্টেম্বর) মহাসমাবেশে যোগদানের জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানান।

উক্যনু মারমাকে আটক ও হেনস্তার ঘটনা ছাত্র-জনতাকে প্রবলভাবে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। ফলে ২৬ সেপ্টেম্বর আয়োজিত মহাসমাবেশে বিপুল সংখ্যক ছাত্র জনতা অংশ নেন। শহহরের চেঙ্গী স্কোয়ারে উক্ত সমাবেশ চলাকালে সেনাবাহিনীর একটি পিকআপ ছাত্র-জনতার ওপর দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সমাবেশে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে কিছু ছাত্র-যুবক সেনাবাহিনীর গাড়িকে ধাওয়া করে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি শান্ত হলে সমাবেশ থেকে উক্যনু মারমা ২৭ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি জেলায় সকাল-সন্ধ্যা সড়ক অবরোধ কর্মসূচির ঘোষণা দেন। 

সেটলাররা যেভাবে হামলা চালায়

মহাসমাবেশ থেকে ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে ২৭ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি সদরসহ বিভিন্ন স্থানে শান্তিপূর্ণভাবে সড়ক অবরোধ পালিত হতে থাকে। এমতাবস্থায় ঐদিন দুপুর ১২টার দিকে কয়েকজন সেটলার যুবক পরিকল্পিতভাবে টমটম ও মোটর সাইকেলে করে খাগড়াছড়ি সদরের সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট-টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজ এলাকায় গিয়ে অবরোধ পালনকারী পিকেটারদের উস্কানি দিতে থাকে। এতে পিকেটারদের সাথে সেটলার যুবকদের বাগবিতণ্ডা হয়।

পরে সেটলার যুবকরা সেখান থেকে চলে গেলেও কিছুক্ষণ পর তারা আবার সংঘবদ্ধ হয়ে সেখানে ফিরে এসে অবরোধ পালনকারী পিকেটারদের ওপর হামলা চালালে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এতে উভয়ের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সেটলাররা সেনাবাহিনীর ব্যবহৃত গুলির সিসা-সহ ধারালো অস্ত্র দিয়ে অবরোধ পালনকারী জুম্ম ছাত্র-জনতার ওপর হামলা চালায়। সেটলারদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে রিকেন চাকমা নামে একজন গুরুতর জখম হন। তিনি একজন পিকআপ চালক। তার বাড়ি দীঘিনালায় বড়াদাম গ্রামে। এছাড়া খাগড়াছড়ির সিঙ্গিনালা মারমা পাড়ার থৈইরি মারমার ছেলে বাকুলু মারমা ও থুইহ্লাপ্রু মারমার ছেলে কালাইয়া মারমা এতে আহত হন বলে জানা যায়।

এদিকে, হামলার খবর পেয়ে বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন হামলা প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে থাকলে পরিস্থিতি চরম পর্যায়ে চলে চায়। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। তবে তারা অবরোধ পালনকারী জুম্ম ছাত্র জনতাকে থামানোর চেষ্টা করলেও হামলাকারী সেটলারদের নিবৃত্ত করার কোনো চেষ্টা করেনি। 

এমতাবস্থায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসন ঐদিন বেলা ২টা থেকে খাগড়াছড়ি পৌরসভা ও সদর উপজেলায় অনির্দিষ্টকালের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করে এবং ৭ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করার ঘোষণা দেওয়া হয়। অপরদিকে, একই দিন গুইমারা উপজেলা প্রশাসনও সেখানে অনির্দিষ্টকালের জন্য ১৪৪ ধারা জারির ঘোষণা দেয়, যদিও সেখানে অপ্রীতিকর কোনো ঘটনা ঘটেনি। 

১৪৪ ধারা জারির মধ্যে হামলা

প্রশাসনের ১৪৪ ধারা জারির মধ্যে বিকাল সাড়ে ৩টা থেকে ৪টার দিকে সেটলার বাঙালিরা খাগড়াছড়ি শহরের মহাজন পাড়ায় গিয়ে আক্রমণ শুরু করে এবং পাড়ায় প্রবেশের নীচের গেইট ভেঙে দেয়। এছাড়া তারা পাহাড়িদের ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান ও ঘরবাড়িতে হামলা-ভাঙচুরের চেষ্টা করে। তবে পাহাড়িরাও সংঘবদ্ধ থাকায় তারা সেখানে বড় বেশি ক্ষতি করতে পারেনি। প্রায় দুই ঘন্টা পর একদল সেনা সদস্য সেখানে উপস্থিত হয়ে পাহাড়িদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। এতে পাহাড়িরা প্রতিবাদ জানালে এক পর্যায়ে সেনা সদস্যরা সেটলারদের দিকে গিয়ে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে এবং পাহাড়িদের ঘরের ভিতর ঢুকতে নির্দেশ দেয়। পরে সেটলাররা সেখান থেকে সরে গেলে সেখানকার পরিস্থিতি শান্ত হয়।

এ ঘটনার পরও সেটলাররা ক্ষান্ত হয়নি। তারা সন্ধ্যায় পানখিয়া পাড়া এলাকায় গিয়ে য়ংড বৌদ্ধ বিহারে হামলার চেষ্টা চালায়। তবে এলাকার জনগণ তাদের প্রতিরোধ করলে বিহারে হামলা করতে না পেরে তারা বিহারের সামনে জড়ো হওয়া লোকজনের ওপর হামলা চালায়। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে হামলাকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু সেনা পুলিশের উপস্থিতিতেই সেখানে সেটলাররা ৩ জন পাহাড়িকে যুবককে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করে। এরা হলেন- কুমিয়া ত্রিপুরা (২৫), মংসাঅং মারমা (২২) ও মংহ্লা মারমা। সেটলার বাঙালিরা সেখানে আশে-পাশে পাহাড়িদের দোকানপাটেও হামলা-ভাঙচুর চালায়।

তবে খাগড়াছড়ি শহরে হামলার ঘটনাা ঘটলেও অন্যান্য উপজেলাগুলোতে স্বতঃস্ফুর্তভাবে সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালিত হয়। 

পানখাইয়া পাড়া য়ংড বৌদ্ধ বিহারে এলাাকায় ভাঙচুর হওয়া একটি দোকান। ফাইল ছবি

ঘটনার বিচার হয়নি

এক বছরেও এই হামলার ঘটনায় জড়িত সেটলারদের গ্রেফতার ও বিচার করা হয়নি। বরাবরের মতো হামলাকারীরা রেহাই পেয়ে গেছে। এই বিচার না হওয়ার কারণেই সেটলাররা বার বার পাহাড়িদের ওপর হামলা চালানোর সাহস পেয়ে থাকে।

সরকারকে অবশ্যই সেদিন হামলার সাথে জড়িত সেটলারদের চিহ্নিত করে তাদেরকে আইনের আওতায় এনে বিচার ও শাস্তি প্রদান করতে হবে- এমনতাই দাবি পাহাড়িদের।

উল্লেখ্য, এই হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে সেদিন রাতে জুম্ম ছাত্র জনতা তাদের ফেসবুক পেইজের মাধ্যমে পূর্বে উত্থাপিত মারমা কিশোরী ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত সকল ধর্ষককে গ্রেফতার ও বিচারের দাবিসহ হামলার প্রতিবাদে পরদিন (২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫) থেকে খাগড়াছড়ি জেলায় লাগাতার অবরোধ কর্মসূচির ঘোষণা দেয়। 



This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More