চবিতে লংগদু গণহত্যার নিহতদের স্মরণে পিসিপি’র আলোচনা সভা ও প্রদীপ প্রজ্বলন

চবি প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
সোমবার, ৪ মে ২০২৬
লংগদু গণহত্যার ৩৭ বছর উপলক্ষে নিহতদের স্মরণে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে(চবি) আলোচনা সভা ও প্রদীপ প্রজ্বলন করেছে বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ(পিসিপি), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।’
আজ সোমবার (৪ মে ২০২৬) সন্ধ্যা ৬টার সময় চবির বুদ্ধিজীবী চত্ত্বরে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
আলোচনা সভায় পিসিপি চবি শাখার সাধারণ সম্পাদক সুদর্শন চাকমার সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর চবি শাখার সংগঠক এবং অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান হল সংসদের ভিপি রিপুল চাকমা, পিসিপি চট্টগ্রাম মহানগর শাখার ১৬তম কাউন্সিল প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক অংহ্লাচিং মারমা। এতে সভাপতিত্ব করেন বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ভূবন চাকমা।
আলোচনা সভা শুরুতে লংগদু গণহত্যায় নিহতদের স্মেরণে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
সভায় রিপুল চাকমা তার বক্তব্যে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ি জাতিসত্তার মানুষের ওপর দমন-পীড়ন চালানো হচ্ছে। পাহাড়ে লংগদু গণহত্যাসহ ডজনেরও বেশি গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, কিন্তু এসব ঘটনার বিচার এখনো আমরা পাইনি।

তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর যখন পাহাড়ে জাতিসত্তার স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়, তখন দীঘিনালা, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটে। এসব হামলায় অনিক, রুবেল, ধন রঞ্জনসহ অনেকেই নিহত হন।
তিনি অভিযোগ করে আরো বলেন, পাহাড়ে যখনই অধিকার আদায়ের আন্দোলন জোরদার হয়, তখন তা দমন করতে রাষ্ট্রযন্ত্র এ ধরনের সাম্প্রদায়িক হামলার আশ্রয় নেয়। আজকের পাহাড়ের জুম্ম সমাজ নিজেদের অধিকার আদায়ে যথেষ্ট সচেতন ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
অংহ্লাচিং মারমা বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি জাতিসত্তার মানুষের ওপর ধারাবাহিকভাবে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন চালানো হচ্ছে। লংগদু গণহত্যা ছাড়াও লোগাং, কমলপতিসহ ডজনখানেক গণহত্যার ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এসব গণহত্যার বিচার আজও নিশ্চিত করা হয়নি। বারবার এই ধরনের সহিংসতা ও দমনমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে আমাদের অস্তিত্বকে মুছে ফেলার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।

তিনি আরও বলেন, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সংগ্রাম ছাড়া কোনো জাতি তার অধিকার টিকিয়ে রাখতে পারেনি। তাই আমাদেরও নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় লড়াই সংগ্রামের পথেই এগিয়ে যেতে হবে। আজকের ছাত্রসমাজকে এই বাস্তবতা অনুধাবন করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে চলমান অন্যায়, সহিংসতা ও সংগঠিত নিপীড়নের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজকে জোরালোভাবে কথা বলতে হবে। নীরবতা কখনোই ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান হতে পারে না।
তিনি বলেন, লংগদু গণহত্যার প্রতিবাদের মধ্য দিয়েই পিসিপির যাত্রা শুরু হয়। সেই আপোষহীন সংগ্রামের ধারা আজও অব্যাহত রয়েছে। এই সংগঠন বরাবরই পাহাড়ের মানুষের ন্যায্য অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদার দাবিতে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে আসছে।
সভাপতির বক্তব্যে ভূবন চাকমা বলেন, আজ লংগদু গণহত্যার ৩৭ বছর পূর্ণ হলো। এই দিনে লংগদুর তিনটিলা, মানিক্যাপাড়া, বাত্যাপাড়া, ডানে আটারকছড়া, বামে আটারকছড়া ও করল্যাছড়ি এলাকায় সেনাবাহিনী ও ভিডিপির সহায়তায় ভয়াবহ গণহত্যা সংঘটিত হয়।এতে ৩২ জন জুম্ম নিহত হন, ১১ জন আহত হন। এছাড়া ৬টি বৌদ্ধ বিহার, ২টি গির্জা, ৯টি গ্রাম, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি উচ্চবিদ্যালয় পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার পরদিন ৫ই মে ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল আব্দুস সালাম, রাঙামাটি ব্রিগেড কমান্ডার এবং কয়েকজন পাহাড়ি নেতা ঘটনাস্থল তিনটিলা পরিদর্শনে গিয়েছিল। সেখানে এক পাহাড়ি নেতা হামলার কারণ জানতে চাইলে একজন সেটলার বাঙালি বলেন, সেনাবাহিনী ও ভিডিপির নির্দেশনা ছাড়া এমন ঘটনা ঘটতে পারত না। পরে তার কাছ থেকে মাইক কেড়ে নেওয়া হয়। এই ঘটনাটি থেকে বোঝা যায়, গণহত্যাটি সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় সংঘটিত হয়েছিল। এছাড়া ৩ নম্বর লংগদু মৌজার হেডম্যান অনিল বিহারী চাকমার বাড়ি উপজেলা সদরে থাকা সত্ত্বেও তার পরিবার ও সেখানে আশ্রয় নেওয়া মানুষদের কীভাবে হত্যা করা হলো এ প্রশ্নও তিনি তোলেন।
তিনি উল্লেখ করে বলেন, সে বছর ৯ই মে রাজা দেবাশীষ রায়সহ ২২ জন ব্যক্তি ন্যায়বিচার ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবিতে রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেন।কিন্তু এত বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো কোনো তদন্ত বা বিচার হয়নি। দেশে বারবার সরকার পরিবর্তন হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত বহু গণহত্যার বিচার না হওয়ায় এখনো ধর্ষণ, গণহত্যা ও ভূমি দখলের মতো ঘটনা চলমান রয়েছে।
ছাত্রসমাজকে আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নীরব থাকা আত্মঘাতী। পার্বত্য চট্টগ্রামের সচেতন ছাত্রসমাজ যদি এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না করে, তাহলে একসময় এর প্রভাব তাদের ওপরও পড়বে। তিনি ঐক্যবদ্ধ হয়ে সব ধরনের অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তোলার জন্য ছাত্র সমসাজের প্রতি আহ্বান জানান।
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
