দক্ষিণ কোরিয়ায় জুম্মদের “বৈ-সা-বি” উৎসব উদযাপন

ডেস্ক রিপোর্ট, সিএইচটি নিউজ
মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬
দক্ষিণ কোরিয়ায় বসবাসত জুম্মরা গত রবিবার (১৯ এপ্রিল ২০২৬) তাদের ২১তম “বৈ-সা-বি” উৎসব উদযাপন করেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার গেয়ংগি প্রদেশের জিম্পো শহরের হ্যাংগাং নিউ টাউন লেক পার্কে এই উৎসবের আয়োজন করা হয়।
২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘জুম্ম পিপলস নেটওয়ার্ক কোরিয়া’ (জেপিএনকে) এবং জিম্পো সিটি ফরেন রেসিডেন্টস সাপোর্ট সেন্টারের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই উৎসবটি প্রথাগত ফুল নিবেদন, ১১টি জুম্ম জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে একটি শান্তি মিছিল এবং ‘ক্কোগুমে পুংমুলদান’ (Kkogume Pungmuldan) দলের পরিবেশনায় কোরীয় বাদ্যযন্ত্র (সামুল নরি) পারফরম্যান্সের মাধ্যমে শুরু হয়।

জুম্ম জনগোষ্ঠীর প্রধান ঐতিহ্যবাহী উৎসব ‘বৈ-সা-বি’ শব্দটি এসেছে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি প্রধান জাতিগোষ্ঠীর নববর্ষ উৎসবের নামের আদ্যক্ষর নিয়ে: চাকমাদের ‘বিঝু’ (Bizu), মারমাদের ‘সাংগ্রাই’ (Sangrai) এবং ত্রিপুরাদের ‘বৈসুক’ (Boishuk)।
স্থানীয় চান্দ্র পঞ্জিকা অনুযায়ী বিদায়ী বছরের শেষ দুই দিন এবং নববর্ষের প্রথম দিনে এই উৎসব পালিত হয়। এটি জুম্মদের ক্ষমা, করুণা, সাম্য, শান্তি এবং জাতিগত সংহতির মূল্যবোধকে ধারণ করে, যা তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় উদযাপন এবং নতুন শুরুর আশার প্রতিফলন।
জেপিএনকে-এর সভাপতি নিখিল চাকমা উৎসবে সকল অংশগ্রহণকারীকে স্বাগত জানিয়ে বক্তব্য দেন এবং তাদের উপস্থিতির জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন যে, জিম্পো শহরের নাগরিকদের যত্ন, ভালোবাসা এবং সংহতির কারণে জুম্ম সম্প্রদায় এখানে বসতি স্থাপন করতে পেরেছে, যেটিকে তিনি তাদের ‘দ্বিতীয় জন্মভূমি’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, এই অর্জন ২০০২ সাল থেকে যারা কঠোর পরিশ্রম করেছেন এবং এখনও অবদান রাখছেন, তাদের ত্যাগ ও সহনশীলতার ফল।
সাম্প্রতিক বছরগুলোর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন যে, কোরিয়ার বিধ্বংসী দাবানলের কারণে গত বছরের উৎসব পরিকল্পনা অনুযায়ী করা সম্ভব হয়নি। আন্তর্জাতিক সংঘাতের ফলে চলমান বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও তিনি আশা ও আনন্দ প্রকাশ করেন যে, এবারের উৎসব শান্তি ও নতুন উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উদযাপিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, এই উৎসব কেবল একটি সাংস্কৃতিক উদযাপন নয়, বরং বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রচার এবং আশার আলো সঞ্চারের একটি অর্থবহ উপলক্ষ। জিম্পো শহরকে ‘বহুসাংস্কৃতিক শহর’ হিসেবে ঘোষণা করায় এবং বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার প্রচেষ্টার জন্য তিনি শহর কর্তৃপক্ষের প্রশংসা করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, এই উৎসব এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচির মাধ্যমে মানুষ সততা, করুণা এবং ন্যায়পরায়ণতার মতো গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধগুলো শিখতে ও গ্রহণ করতে পারবে।

তিনি বিশ্বজুড়ে শান্তির জন্য আন্তরিক প্রার্থনা করেন এবং জিম্পোকে একটি স্বাস্থ্যকর ও শক্তিশালী সম্প্রদায় হিসেবে গড়ে তুলতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানান।
জুম্মরা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য চট্টগ্রামের (CHT) আদিবাসী বাসিন্দা, যা ১১টি ভিন্ন জাতিগোষ্ঠী নিয়ে গঠিত। প্রায় ৯ লক্ষ জনসংখ্যা নিয়ে তারা বাংলাদেশের মোট ১৭ কোটি জনসংখ্যার ১ শতাংশেরও কম। জাতিসত্তা, ভাষা, ধর্ম এবং সংস্কৃতির দিক থেকে তারা বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী থেকে স্বতন্ত্র।


১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে প্রায় ১ লক্ষ মানুষের জোরপূর্বক উচ্ছেদের পর থেকে জুম্মরা জাতিগত নির্মূল নীতি, অবৈধ আটক, নির্যাতন এবং ভূমি দখলসহ প্রতিনিয়ত মানবাধিকার লঙ্ঘনের সম্মুখীন হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং জুম্ম সম্প্রদায় এখন ভারত, কোরিয়া, জাপান, ওশেনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং এর বাইরেও বিভিন্ন দেশে বসতি স্থাপন করেছে।
জেপিএনকে কোরিয়ায় বসবাসরত জুম্ম অভিবাসী ও শরণার্থীদের সহায়তা করে, তাদের অধিকারের পক্ষে কথা বলে এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় ও আদিবাসীদের সমস্যা সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করে।
(প্রতিবেদনটি The Korea Times থেকে অনুবাদকৃত ও আংশিক সংশোধিত)
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
