সকল জাতিসত্তার সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও পূর্ণস্বায়ত্তশাসন মেনে নেয়ার দাবিতে বাঘাইছড়িতে সমাবেশ

0


বাঘাইছড়ি প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ

মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

“পঞ্চদশ সংশোধনী আইন ও ‘বাঙালি জাতীয়তার’ কী হলো জবাব চাই” শ্লোগানে সকল জাতিসত্তার সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও পার্বত্য চট্টগ্রামে পূর্ণস্বায়ত্তশাসন মেনে নেয়ার দাবিতে বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকের মাজলংয়ে সমাবেশ করেছে তিন সংগঠন।

আজ মঙ্গলবার (৩০ জুন ২০২৬) সকালে ‘বিতর্কিত পঞ্চদশ সংবিধান সংশোধনী আইন পাসের” ১৫তম বার্ষিকীতে গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম (ডিওয়াইএফ), বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) ও হিল উইমেন্স ফেডারেনশন(এইচডব্লিউএফ) যৌথভাবে এই সমাবেশের আয়োজন করে। এতে এলাকার প্রায় ৩ শতাধিক লোকজন স্বতঃস্ফুর্তভাবে অংশগ্রহন করেন।

সমাবেশে বক্তব্য রাখেন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রিতা চাকমা, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের রাঙামাটি জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক পলেন চাকমা ও গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের বাঘাইছড়ি উপজেলার শাখার সহ-সাধারণ সম্পাদক সমর চাকমা প্রমুখ।

সমাবেশে ‘বাঙালি’ ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ ‘উপজাতি’ নই; সকল জাতিসত্তার সাংবিধানিক স্বীকৃতি দাও; ‘উগ্র বাঙালি জাতীয়তা’ ‘ধর্মীয় বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ নয়, নতুন সংবিধান রচনা কর; সকল জাতিসত্তার সাংবিধানিক স্বীকৃতি দাও; ভূমি বেদখল বন্ধ কর; অপারেশন উত্তরণের নামে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বন্ধ কর”  ইত্যাদি দাবি সম্বলিত প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করা হয়।

সমাবেশে নারী নেত্রী রিতা চাকমা বলেন, ২০১১ সালে ৩০ জুন তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার বিতর্কিত পঞ্চদশ সংবিধান সংশোধনীর ৬ নং অনুচ্ছেদের ২ নং ধারায় দেশের ভিন্ন ভাষাভাষী সকল জাতিসত্তার ওপর বাঙালি জাতীয়তা চাপিয়ে দেয়। এর বিরুদ্ধে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশে আন্দোলন হলেও সেই সংশোধনী এখনো বাতিল করা হয়নি। বর্তমান ক্ষমতাসীন তারেক রহমানের সরকারও সেই সংশোধনীর মাধ্যমেই দেশ পরিচালনা করছেন।

তিনি আরো বলেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরবর্তী ৭২ সালে শেখ মুজিব সরকারের প্রণীত সংবিধানে সবাইকে বাঙালি হিসেবে উল্লেখ করা হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের তৎকালীন সংসদ সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ন লার্মা তার প্রতিবাদ জানিয়ে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছিলেন। পরবর্তী সরকারগুলো সংবিধান থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ তুলে নিলেও শেখ হাসিনা সরকার পূনরায় সংবিধানে বাঙালি জাতীয়তা চাপিয়ে দিয়ে জাতিসত্তাগুলোর অস্তিত্ব ধ্বংস করে দেয়ার চক্রান্ত করেছিল। যার মাধ্যমে এখনো পাহাড়ি ও সমতলের জাতিসত্তাগুলোকে সম্বোধনের ক্ষেত্রে ‘জনাব’, ‘বেগম’ ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি ‘মোহাম্মদ’ পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়েছে।

তিনি বর্তমান বিএনপি সরকারও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের আড়ালে জাতিসত্তাগুলোকে বিলীন করে দেওয়ার চক্রান্ত করছে বলে মন্তব্য করেন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সমতলের বসবাসকারী সকল জাতিসত্তাগুলো স্ব স্ব জাতিগত পরিচয়ে সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং পূর্ণস্বায়ত্তশাসন দাবি মেনে নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবি জানান।

ছাত্রনেতা পলেন চাকমা বলেন, পঞ্চদশ সংবিধান সংশোধনী আইন পাসের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার জোর করে সকল জাতিসত্তাগুলোর ওপর বাঙালি জাতীয়তা চাপিয়ে দিয়েছিলো। এদেশে বসবাসকারী ৪৫টির অধিক সংখ্যালঘু জাতিসত্তা বাঙালি নয়। তাদের নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিগত পরিচয় রয়েছে। তাই সংবিধানে সকল জাতিসত্তার স্ব স্ব জাতিগত পরিচয় অন্তর্ভুক্ত করে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার যে সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে দেশের জাতিসত্তাগুলোকে বাঙালি বানিয়েছে, সেই একই সংবিধান বহাল রেখে বর্তমান বিএনপি সরকার দেশ পরিচালনা করছে। শুধু তাই নয়, শেখ হাসিনা সরকার যেভাবে পাহাড়ে সেনাশাসন জারি রেখে এবং ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী সৃষ্টি করে নিপীড়ন-নির্যাতন, খুন-গুমসহ মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছিল, বর্তমান তারেক রহমানের সরকারও একই দমননীতি বজায় রেখেছে। যার ফলে পাহাড়ে যে সংকট তা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তিনি পাহাড়ের সমস্যা স্থায়ী সমাধানের জন্য সাংবিধানিক গ্যারান্টিসহ পূর্ণস্বায়ত্তশাসন প্রদানের দাবি জানান।

যুবনেতা সমর চাকমা বলেন, যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন তারা দেশে বসবাসরত জাতিসত্তাগুলোর পরিচয় মুছে দিতে নানা চক্রান্ত করে থাকে। আওয়ামী লীগ সরকার যেমন বাঙালি জাতীয়তা চাপিয়ে দিয়ে নিপীড়ন-নির্যাতনের মাধ্যমে জাতিসত্তাগুলোকে বিলীন করে দেয়ার ষড়যন্ত্র করেছে, একইভাবে বর্তমান বিএনপি সরকারও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও সমানাধিকারের কথা বলে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের সংখ্যায় কম জাতিসত্তাগুলোর অস্তিত্ব বিলীন করে দেয়ার ষড়যন্ত্র করছে। তাই আমরা একটি নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধান চাই, যে সংবিধানে সকল জাতিসত্তার স্ব স্ব জাতিগত পরিচয়ের স্বীকৃতি থাকবে।

তিনি আরো বলেন, যে জাতি পাকিস্তানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে দেশ স্বাধীন করে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে সে জাতি আজ নিজ দেশের জাতিসত্তাগুলোর ওপর অত্যাচার, নিপীড়ন চালাচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ক্ষমতায় বসে তারা দেশের সংখ্যালঘু জাতিগুলোকে কখনো ‘উপজাতি’, কখনো ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠি’ বলে অপমানিত করছে।

তিনি অবিলম্বে বিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলপূর্বক পার্বত্য চট্টগ্রাম-সহ দেশে বসবাসরত সকল জাতিসত্তাগুলোর স্ব স্ব জাতিগত পরিচয় সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে একটি নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়ন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে পূর্ণস্বায়ত্তশাসন মেনে নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।



This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More