সংবিধানে এখনো ‘বাঙালি জাতীয়তা’ চাপিয়ে দেওয়া বিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনী বহাল রয়েছে

বিশেষ প্রতিবেদন, সিএইচটি নিউজ
মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে সংবিধানের বিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনী বিল পাস হয় ২০১১ সালের ৩০ জুন। এই সংশোধনীর মাধ্যমে দেশের ভিন্ন ভাষাভাষী সংখ্যালঘু জাতিসত্তাসমূহের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় বাঙালি জাতীয়তাবাদ। আওয়ামী লীগ সরকার সংখ্যাগরিষ্টতার জোরে তড়িঘড়ি করে সংসদে উক্ত পঞ্চদশ সংশোধনী বিলটি পাস করে নেয়। এতে ৬ অনুচ্ছেদের (২)-এ বলা হয়েছে “বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসেবে বাঙালি এবং নাগরিকগণ বাংলাদেশী বলিয়া পরিচিতি হইবেন”। যদিও কারা জনগণ আর কারা নাগরিক কিংবা জনগণ ও নাগরিকের মধ্যে পার্থক্য কী তার কোন ব্যাখ্যা সরকার দেয়নি।
বর্তমান ক্ষমতাসীন তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারও এখনো এই অনুচ্ছেদটি বহাল রেখে দেশ পরিচালনা করছে।
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে কার্যত দেশে বসবাসরত চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, খিয়াং, ম্রো, খুমি, তঞ্চঙ্গ্যা, বম, পাংখো, রাখাইন, সান্তাল, গারো, মনিপুরি, ওঁরাওসহ দেশে বসবাসরত ৪৫টির অধিক জাতিসত্তার অস্তিত্বকে অস্বীকার করা হয়েছে।
উক্ত বিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের দাবিতে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশে ব্যাপক প্রতিবাদ, বিক্ষোভ হয়েছে। এখনো প্রতিবাদ চলমান রয়েছে। কিন্তু সংখ্যালঘু দরদী ভাণ করা আওয়ামী লীগ তার শাসনামলে এ সংশোধনী বাতিল বা সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার পতনের পর ড. ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার হাইকোর্টের মাধ্যমে পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি ধারা বাতিল করলেও ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ বা ‘বাঙালি জাতীয়তা’ চাপিয়ে দেওয়ার বিতর্কিত অনুচ্ছেদটি বাতিল করেনি। যদিও অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠনের মাধ্যমে জুলাই সনদ প্রণয়ন করে সংবিধান সংস্কারের জন্য পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে সরকারের কার্যকাল শেষ করে।
চলতি বছর ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্টতা অর্জন করে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। জুলাই সনদের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা থাকলেও, বিএনপি জুলাই সনদে স্বাক্ষর করলেও ক্ষমতাসীন হওয়ার পর তারা তা মেনে নেয়নি। তারা এখন সংবিধান সংস্কার না করে সংশোধন করার কথা বলছে। এ লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠনের কথা সংসদে বলতে শোনা গেলেও এখনো এ কমিটি গঠন করা হয়েছে কিনা তা জানা যায়নি। বর্তমান বিএনপি সরকার ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদের’ পরিবর্তে “বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের’ কথা বলছে। তবে সেখানেও সংখ্যালঘু জাতিসত্তাগুলোকে অস্বীকার বা তাদের জাতিগত অস্তিত্ব বিলীন করে দেওয়ার সুক্ষ্ম ষড়যন্ত্র বিদ্যমান রয়েছে তা বলাই বাহুল্য।
স্মর্তব্য যে, সংবিধানের এই পঞ্চদশ সংশোধনী আনয়নের জন্য তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার একটি কমিটি গঠন করেছিল। সংসদে আইনটি পাসের পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের কাছ থেকে মতামত গ্রহণ করে ইউপিডিএফ ২০১০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর সংবিধান সংশোধনী কমিটির নিকট দেশের সকল জাতিসত্তার স্ব স্ব পরিচয়ে সাংবিধানিক স্বীকৃতি, পার্বত্য চট্টগ্রামকে ‘স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল’ ঘোষণাসহ ৬ দফা সংশোধনী প্রস্তাবনা দিয়েছিল। এছাড়া বিভিন্ন সংগঠন ও দেশে বসবাসরত জাতিসত্তাসমূহের পক্ষ থেকেও নানা প্রস্তাবনা পেশ করা হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার এসব দাবি-দাওয়ার কোন গুরুত্ব না দিয়ে বিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনী বিল পাস করে।
এখানে আরো উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, মুলত বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকে আওয়ামী লীগ এদেশে বসবাসরত বাঙালি ভিন্ন অন্য জাতিগুলোকে বাঙালি বানানোর প্রক্রিয়া শুরু করে। যার কারণে ১৯৭২ সালের সংবিধানেও বাংলাদেশের নাগরিকদেরকে “বাঙালি” হিসেবে অভিহিত করা হয়েছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামের নেতৃবৃন্দ এর বিরুদ্ধে সে সময় সংসদের ভেতরে ও বাইরে তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন।
’৭২ সালের ৩১ অক্টোবর সংসদে খসড়া সংবিধানের ৬ অনুচ্ছেদে সরকারদলীয় সংসদ সদস্য আব্দুর রাজ্জাক ভূঁইয়া বাঙালি জাতীয়তা অন্তর্ভুক্ত করে সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করলে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছিলেন, “মাননীয় স্পীকার, আমি যে অঞ্চল থেকে এসেছি, সেই পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীরা যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশে বাস করে আসছে। বাংলাদেশের বাংলা ভাষা বাঙালিদের সঙ্গে আমরা লেখাপড়া শিখে আসছি। বাংলাদেশের সংগে আমরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সবদিক দিয়েই আমরা একসঙ্গে একযোগে বসবাস করে আসছি। কিন্তু আমি একজন চাকমা। আমার বাপ, দাদা চৌদ্দ পুরুষ– কেউ বলে নাই, আমি বাঙালি। …আমি জানি না, আজ আমাদের এই সংবিধানে আমাদেরকে কেন বাঙালি বলে পরিচিত করতে চায়’’।
এরপর স্পিকার তাঁকে ‘আপনি কি বাঙালি হতে চান না’? এমন প্রশ্ন করলে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা উত্তরে বলেছিলেন, ‘আমাদেরকে বাঙালি জাতি বলে কখনও বলা হয় নাই। আমরা কোনো দিনই নিজেদেরকে বাঙালি বলে মনে করি নাই। আজ যদি এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সংবিধানের জন্য এই সংশোধনী পাশ হয়ে যায়, তাহলে আমাদের এই চাকমা জাতির অস্তিত্ব লোপ পেয়ে যাবে। আমরা বাংলাদেশের নাগরিক। আমরা আমাদেরকে বাংলাদেশী বলে মনে করি। কিন্তু বাঙালি বলে নয়”।
কিন্তু সংখ্যাগরিষ্টতার জোরে সেদিন সংসদে “বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাঙালি বলিয়া পরিচিত হইবেন’ এই প্রস্তাবটি সংসদে পাস করা হলে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা তা প্রত্যাখ্যান করে প্রতিবাদস্বরূপ সংসদ কক্ষ থেকে বের হয়ে যান। বাঙালি জাতীয়তাবাদ চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে তিনি ’৭২-এ সংসদে গৃহিত সংবিধান আইনে স্বাক্ষর করেননি বলেও জানা যায়।
পরবর্তীতে ক্ষমতার পালাবদল ঘটলে বিএনপি ক্ষমতায় এসে সংবিধান থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ রহিত করে তার পরিবর্তে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ অন্তর্ভুক্ত করে। কিন্তু তারাও দেশের সংখ্যালঘু জাতিসমূহকে স্ব স্ব জাতিগত পরিচয়ে সাংবিধানিক স্বীকতি দেয়নি।
এরপর ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ ’৭২ এর সংবিধান পুনঃপ্রবর্তনের কথা বলে সংখ্যাগরিষ্টতার জোরে সংসদে ‘পঞ্চদশ সংশোধনী’ বিল পাস করে পূনরায় সংবিধানে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ অন্তর্ভুক্ত করে। এতে দেখা গেল, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা এর প্রতিবাদ তো করেনই নি, বরং টেবিল চাপড়িয়ে এর সমর্থন দিয়েছেন। যে দলিলে তাদেরকে ও তাদের নিজ নিজ জাতির জনগণকে বাঙালি বলে হেয় ও অবজ্ঞা করা হয়েছে সে দলিলে তারা বিনা দ্বিধায় স্বাক্ষর করেছেন! এটা জাতির জন্য বড়ই লজ্জার।
বাঙালি জাতীয়তা চাপিয়ে দেওয়া এই পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের দাবি জানিয়ে ইউপিডিএফের নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ লাল পতাকা মিছিল, তিন জেলা জুড়ে সর্ববৃহৎ ও দীর্ঘ গণ-মানববন্ধন, বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, লাল কার্ড প্রদর্শন–ইত্যাদি নানা কর্মসূচি পালন করেছে এবং এখনো এ দাবিতে সোচ্চার রয়েছে।
বিতর্কিত এই পঞ্চদশ সংশোধনীর ক্ষমতাবলে শাসকগোষ্ঠি ভিন্ন ভাষাভাষী জাতিসত্তাগুলোকে বাঙালি বানানোর প্রক্রিয়াও শুরু করেছিল। বিভিন্ন সরকারি চিঠিপত্র ও দলিলে জাতিসত্তার প্রতিনিধিদেরকে ‘জনাব’, ‘বেগম’ এমনকি ২০২২ সালে রাঙামাটির লংগদু থানা পুলিশের এক এএসআই কর্তৃক চাকমা সম্প্রদায়ের এক বাদিকে “মো.” সম্বোধন করে নোটিশ জারি করেছিল। যদিও পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের আপত্তির মুখে তিনি এর জন্য ভুল স্বীকার করেছিলেন।
শুধু তাই নয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গার নামও পরিবর্তন করা হয়। পাহাড়িদের আদি নাম বাদ দিয়ে তার পরিবর্তে ইসলামী নাম বসিয়ে সাইনবোর্ড লাগানো হয়।
অন্যদিকে, উক্ত বিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনীর কারণে শাসকগোষ্ঠি এবং পাহাড়ের সেটলার বাঙালিরা পাহাড়িদেরকে অপমানসূচক “উপজাতি’, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ইত্যাদি আখ্যায়িত করে থাকে। সম্প্রতি বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও সংসদে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন।
বর্তমান ক্ষমতাসীন তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার সংবিধান সংশোধনের জন্য কমিটি গঠনের কথা বলছে। তবে সংসদের বিরোধী দল জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের দাবি তুলছে।
বিএনপি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ শ্লোগানে ‘বাংলাদেশে বসবাসকারী সবাই বাংলাদেশী’ বলে প্রচারণা চালাচ্ছে। তাদের এই ‘বাংলাদেশী’ জাতীয়তাবাদের মধ্যেও পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশে বসবাসরত ভিন্ন ভাষাভাষী জাতিসত্তাগুলোকে অস্বীকার করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে সরকার এখনো সংবিধান সংশোধন বা সংস্কারের উদ্যোগ নেয়নি। সংবিধানে এখনো শেখ হাসিনা সরকারের ‘বাঙালি জাতীয়তা’ চাপিয়ে দেওয়া বিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনী বহাল রয়েছে এবং এর ভিত্তিতে সংসদ ও দেশ পরিচালিত হচ্ছে।
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরও যদি দেশের সংবিধানকে প্রকৃত গণতান্ত্রিক সংবিধানে পরিণত করা না হয় এবং এদেশের বাঙালি ভিন্ন অন্যান্য সংখ্যালঘু জাতিসমূহকে তাদের স্ব স্ব পরিচয়ে সংবিধানে স্বীকৃতি দেওয়া না হয়, তাহলে বাংলাদেশ কখনো একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারবে না।
কাজেই, বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের উচিত হবে একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়নে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া এবং এ উদ্যোগের সাথে সকল জাতিসত্তার প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের ভিন্ন ভাষাভাষী সকল জাতিসত্তাসমূহকে তাদের স্ব স্ব জাতিগত পরিচয়ে সাংবিধানিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করা।
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
