হামে শিশুমৃত্যু: জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতি নিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির বিবৃতি

0


ঢাকা প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
শনিবার, ৯ মে ২০২৬

হামে শিশু মৃত্যুতে জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতিতে সংবাদ মাধ্যমে বিবৃতি দিয়েছে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি।

শনিবার (৯ মে ২০২৬) প্রদত্ত বিবৃতিতে বলা হয়, এ বছরের ১৫ মার্চ থেকে ০৮ মে পর্যন্ত যে ৩৪৩ জন শিশু হামে মৃত্যু বরণ করেছে তাদের মধ্যে ল্যাবরেটরি পরীক্ষা দ্বারা নিশ্চিত হচ্ছে ৫৮ জন, বাকী ২৮৫ জন শিশু হামের লক্ষণ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে, শেষ ২৪ ঘন্টায় হাম রোগীর সংখ্যা ১,২১২ জন, হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৯৫০ জন, যাদের মধ্যে হাম শনাক্ত হয়েছে ২৮২ জনের (তথ্যসূত্রঃ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর)। হামে সব বয়সের মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। তবে বয়সের সাথে সাথে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যায়। তাই প্রায় সব মৃত্যুই শিশুদের মধ্যে ঘটেছে।

এতে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, হামের বর্তমান পরিস্থিতি কেবল একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, বরং একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকট—যা আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা ও টিকাদান ব্যবস্থার ঘাটতিকে সামনে নিয়ে এসেছে। হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ, যা প্রতিরোধযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুদের মধ্যে প্রথম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। হামের ব্যাপকতা এত বেড়ে গেছে যে, হামের ভাইরাস আগে টিকা নিয়েছে এমন শিশুদেরকে ও ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদেরকেও সংক্রমিত করেছে। এই মৃত্যুগুলো প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল যদি সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হতো। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক টিকা ক্রয় নিয়ে গাাফলতি, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রীতা, জনস্বাস্থ্যের প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা প্রভৃতি হামের মহামারিকে ডেকে এনেছে এবং ইপিআই কর্মসূচিকে দুর্বল করেছে বলে আমরা মনে করি। যারা প্রতিরোধযোগ্য এ শিশুমৃত্যুর জন্য দায়ী তাদেরকে চিহ্নিত করতে হবে ও তাদের শাস্তি দিতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে হাম একটি অতি সংক্রামক রোগ, লক্ষণ (গায়ে লালচে র‍্যাশ) প্রকাশের চারদিন আগে থেকে এর সংক্রমণ শুরু হয়ে যায়। একজন আক্রান্ত শিশুর মাধ্যমে সমগ্র এলাকা আক্রান্ত হতে পারে। হামের প্রভাবে বিভিন্ন জটিলতা যেমন, নিউমোনিয়া, অন্ধত্ব, মস্তিষ্কের প্রদাহ এমনকি মৃত্যু হতে পারে। হাম হলে শিশুর শরীরে গড়ে ওঠা আগের প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে যেতে থাকে।

বিবৃতিতে চলমান পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্য ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞদের সাথে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির পক্ষ থেকে কয়েকটি জরুরি দাবি ও করণীয় তুলে ধরা হয়। সেগুলো হলো:  

১. টিকাদান কর্মসূচিতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা যেমন ঘনবসতি, দুর্গম অঞ্চল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। টিকার পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।

২. আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত শনাক্ত ও চিকিৎসার জন্য উপজেলা থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। প্রতিটি হাসপাতালে বিশেষ “হাম কর্নার তথা সংক্রামক ব্যধি কর্নার”চালু করা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ ও ভিটামিন এ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। সনাক্ত শিশুদের বিশেষ করে প্রান্তিক পরিবারের শিশুদেরকে সরকারি চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে, শিশুর পরিবারকে উপযুক্ত সামাজিক সহায়তা দিতে হবে, যেন তারা চিকিৎসা করাতে গিয়ে সর্বশান্ত না হয়ে যায়। প্রান্তিক পরিবারের শিশুরা জ্বরে আক্রান্ত হলেও সামর্থ্যের অভাবে অভিভাবক শিশুকে প্রথম পর্যায়েই চিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়ে যেতে পারে না, বিনা চিকিৎসায় শিশুর অবস্থা জটিল হয়। তখন তার অভিভাবকবৃন্দ ঘটি-বাটি বিক্রী করে মরণাপণ্ন শিশুকে নিয়ে ঢাকার দিকে রওনা হন। এটা ঠেকাতে হলে চিকিৎসা সুবিধার বিকেন্দ্রীকরণ করে প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সুব্যবস্থা থাকতে হবে, কাছেই সুসংগঠিত মাধ্যমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান (উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স) থাকতে হবে। মহানগরীতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্বাস্থ্যসেবার প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করতে হবে। মহানগরীতে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও বিশেষায়িত তৃতীয় পর্যায়ের সেবা একই হাসপাতালে দেবার নামে জগাখিচুড়ি, বিশৃঙ্খল, মেঝেতে রোগী রেখে চিকিৎসার নামে প্রহসন বন্ধ করতে হবে। গ্রাম ও শহরে এ ধরণের স্তরভিত্তিক চিকিৎসা ব্যবস্থার পুনর্গঠন করলে একদিকে জটিল রোগীর সংখ্যা কমে যাবে, হামের লক্ষণযুক্ত শিশুরা আইসোলেশনে থাকার কারণে রোগের সংক্রমণেরও নিয়ন্ত্রণ হবে।

৩. টিকা নিয়ে বিদ্যমান ভুল ধারণা ও গুজব মোকাবিলায় কার্যকর জনসচেতনতা কার্যক্রম চালু করতে হবে। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যম, ধর্মীয় নেতা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৪. একটি শক্তিশালী রোগ নজরদারি ব্যবস্থা (surveillance), দ্রুত মোকাবেলা কার্যক্রম (Rapid response) ও জনস্বাস্থ্যের জরুরি অপারেশন কেন্দ্র (public health emergency operation centre) সচল করা, যাতে দ্রুত নতুন সংক্রমণ শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। সনাক্ত শিশুদেরকে উপরে বর্নিত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্বাম্থ্যসেবার আওতায় আনতে হবে।

৫. পুষ্টি ও ভিটামিন এ কার্যক্রম জোরদার করা। অপুষ্ট শিশুদের অগ্রাধিকার দেয়া। মাতৃদুগ্ধপান ও পুষ্টি কর্মসূচি শক্তিশালী করা।

৬. হাম নির্মূল কৌশলপত্র (Measles elimination strategy) পুনরায় সক্রিয় করা।

৭. ভ্যাকসিন সরবরাহ চেইন শক্তিশালী করা।

৮. ভ্যাক্সিন উৎপাদনে জাতীয় সক্ষমতা বাড়িয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা। আইপিএইচ এর ভ্যাক্সিন উৎপাদন সক্ষমতা পুনঃস্থাপন।

৯. ভবিষ্যতে এধরণের জনস্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতি বা স্বাস্থ্য দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য স্ট্যান্ডিং অর্ডার অন পাবলিক হেলথ এমার্জেন্সি (SoPHE) চালু করা।

১০. ৬ টি বিভাগে জনগনের কোটি কোটি টাকায় নির্মিত শিশু হাসপাতালগুলি দ্রুত পূর্ণাঙ্গ ভাবে চালু করতে হবে।

এই সংকট আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাই—এটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করুন।

গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির পক্ষে বিবৃতিটি প্রদান করেন- অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, অধ্যাপক ডা. হারুন-অর-রশীদ, অধ্যাপক ডা. কাজী রকিবুল ইসলাম, ডা. জয়দীপ ভট্টাচার্য, ডা. নাজমুস সাকিব ও সজীব তানভীর।



This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More