কাউখালীতে দুই নারী সংগঠনের ধর্ষণবিরোধী বিক্ষোভ, পাহাড়-সমতলে নারী-শিশু হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবি

0


কাউখালী প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ

রবিবার, ২৪ মে ২০২৬

“সারাদেশে অব্যাহত নারী, শিশু ধর্ষণ বন্ধ কর’ শ্লোগানে পাহাড়ে তুম্রাসিং, কৃত্তিকাসহ আশিয়া, ইরা নিশাত ও রামিসার হত্যাকারী নরপিশাচদের অবিলম্বে ফাঁসি কার্যকরের দাবিতে রাঙামটির কাউখালীতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে পাহাড়ের আন্দোলনকারী দুই নারী সংগঠন হিল উইমেন্স ফেডারেশন ও পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘ, কাউখালী উপজেলা শাখা।

আজ রবিবার (২৪ মে ২০২৬) দুপুর ১টায় কাউখালীর বেতবুনিয়া কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ বিহার গেইটের সামনে থেকে মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি রাঙামাটি – চট্টগ্রাম মহাসড়কে গিয়ে প্রতিবাদ সমাবেশে মিলিত হয়।

বিক্ষোভে কাউখালীর বিভিন্ন জায়গা হতে চার শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী, যুবক-যুবতী, নারী-পুরুষ অংশগ্রহণ করেন।

মিছিল পরবর্তী সমাবেশে পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘের বেতবুনিয়া ইউনিয়ন শাখার নেত্রী উবাইচিং মারমার সভাপতিত্বে ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কাউখালী উপজেলা শাখার দপ্তর সম্পাদক দিপা চাকমার সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সদস্য রিপনা চাকমা ও কাউখালী উপজেলা শাখার সভাপতি একা চাকমা, বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি)-এর রাঙামাটি জেলা শাখা সাধারণ সম্পাদক দিপায়ন চাকমা ও গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কাউখালী উপজেলা শাখার সভাপতি ক্যথুই মার্মা।

সমাবেশে রিপনা চাকমা বলেন, আমরা বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে দেখেছি, গত ১৯ মে ঢাকার পল্লবীতে বাসায় ডেকে নিয়ে নরপিশাচ সোহেল কর্তৃক ৭ বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর ধারালো অস্ত্রত দিয়ে শরীর থেকে মাথা, দু’হাত বিচ্ছিন্ন করে কী নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। এই জঘন্য ঘটনা সারা দেশসহ বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে। আজকের বিবেকের তাড়নায় আমরা রাজপথে নেমে পড়েছি।

তিনি বলেন, রামিসা ধর্ষণের পর খুন হওয়ার ঘটনায় তার বাবা সরকার-রাষ্ট্রের কাছে বিচার চান না। এতে প্রমাণ হয় যে, রাষ্ট্রের সংবিধান, সরকার, আইনের প্রতি জনগণের আর কোন আস্থা নেই। রামিসার হত্যাকাণ্ডের পরে চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় ৪ বছরের শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। আমরা একটু আগে জেনেছি, গতকাল বান্দরবানের থানচিতে ৫ বছরের এক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এভাবে প্রতিদিনই ধর্ষণের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। ফলে দেশে নারী-শিশুরা আর কোথাও নিরাপদ নয়।

তিনি আরও বলেন, ২০১৬ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনু কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের ভেতর ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন। এ জঘন্য ঘটনায় ১ জন ধর্ষককে গ্রেফতার করা হলেও বাকীরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। সমতলে ধর্ষণের মতো ঘটনাগুলোর আংশিক বিচার হলেও পাহাড়ে ধর্ষণের ঘটনার চিত্র তার উল্টো। পাহাড়ে এ যাবত যত ধর্ষণ-ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ঘটেছে তার কোন ঘটনারই বিচার হয়নি। ১৯৯৬ সালে পাহাড়ের অগ্নিকন্যা কল্পনা চাকমা অপহরণের বিচার হয়নি। চিহ্নিত অপহরণকারী লে. ফেরদৌস গংরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। ২০১৮ সালে বিলাইছড়িতে দুই মারমা বোন সেনা সদস্য কর্তৃক ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন। তারও কোন বিচার হয়নি। এই বিচারহীনতার ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের জনগণ রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। যার কারণে জনগণ এখন নিজেদের হেফাজতে ধর্ষকদের বিচার করতে চায়।

তিনি বলেন, রামিসার ধর্ষক ও হত্যাকারী নিজেই ঘটনার দায় স্বীকার করেছেন। তারপরও ডিএনএন টেস্টের নামে বিচারের দীর্ঘসূত্রতা কেন?  

তিনি অবিলম্বে রামিসাসহ সমতল ও পাহাড়ে সংঘটিত নারী-শিশু ধর্ষণ, হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি কার্যকর করার দাবি জানান।

একা চাকমা বলেন, সারা দেশে যেভাবে ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে তাতে শিশু থেকে বৃদ্ধ কোন নারীই আর নিরাপদ নয়। জানুয়ারি থেকে চলতি মে মাস পর্যন্ত দেশে ১১৮ জন কন্যা শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, এর মধ্যে ১৭ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে বলে পত্রিকার প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গেছে। শুধু সমতলে নয়, পার্বত্য চট্টগ্রামেও অহরহ এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। গতকালও বান্দরবানের থানচিতে ৫ বছরের ত্রিপুরা শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আমরা যদি দেখি ২০১৮ সালে ২৮ জুলাই খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার ৯ মাইল এলাকায় ৪র্থ শ্রেণির ছাত্রী কৃত্তিকা ত্রিপুরাকে কীভাবে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। সেই বিচার কি তার মা-বাবা বা আমরা পেয়েছি? গত বছর বান্দরবানে চিংমা খিয়াংকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় জড়িতরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। প্রশাসন তাদের গ্রেফতারের কথা বাদ চিহ্নিতও করতে পারেনি। গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে খাগড়াছড়ির সিঙ্গিনালায় ৮ম শ্রেণির এক মারমা কিশোরীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনার বিচার চাইতে গিয়ে খাগড়াছড়ি সদর ও গুইমারায় পাহাড়িদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলা চালিয়ে তিন জনকে খুনসহ শত শত দোকানাট, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।  

তিনি বলেন, দেশে বিচারহীনতার কারণে ধর্ষণের মতো জঘন্য ঘটনায় অপরাধীরা সহজে পার পেয়ে গিযে আবার একই অপরাধ করে থাকে। ফলে নারী-শিশুরা আরো বেশি অনিরাপদ হয়ে পড়ে।

সমাবেশ থেকে তিনি অবিলম্বে রামিসা, কৃত্তিকা ত্রিপুরাসহ পাহাড় ও সমতলে ধর্ষণ-হত্যাকাণ্ডে জড়িত অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি দেওয়ার জোর দাবি জানান।

ক্যথুই মার্মা বলেন, আমাদের নারীদের পাশাপাশি পুরুষদেরও পার্বত্য চট্টগ্রামে কোনো স্থানে নিরাপত্তা নেই। কারণ এখানে বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে নারী ধর্ষণের যেমন বিচার হয় না, একইভাবে অন্যায় দমন-পীড়ন, খুন-গুমেরও কোন বিচার হয় না।

তিনি সরকার-প্রশাসনের সমালোচনা করে বলেন, দেশে এত এত বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা থাকতে রামিসাসহ প্রতিনিয়ত কীভাবে নারী-শিশু ধর্ষণ-হত্যার শিকার হচ্ছে? যদি শিশুদের জন্য নিরাপত্তা দিতে না পারেন তাহলে কীভাবে সুষ্ঠুভাবে দেশ পরিচালনা করবেন?

তিনি অবিলম্বে নারী-শিশু ধর্ষণকারীদের সর্বোচ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান।

দিপায়ন চাকমা বলেন, আমরা অনেক আগে থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামে নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় তা হয়নি। সমতলে কিছু কিছু ঘটনায় জড়িত অপরাধীদের গ্রেফতার-বিচার করা হলেও পাহাড়ে তাও হয় না। পাহাড়ের ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু বিচার না হওয়ার কারণে আজকে সমতলে ছোট্ট শিশু রামিসাকেও অকালে জঘন্য ঘটনার শিকার হতে হচ্ছে। অপরাধীদের দৃশ্যমান কোন শাস্তি না দেয়ার কারণে আজকে দেশ জুরে নারী শিশুর ধর্ষণের পর নৃশংস হত্যার ঘটনা ঘটছে।

তিনি অবিলম্বে রামিসা, আছিয়া, ইরা, নিশাতসহ পাহাড়ে তুম্রাচিং, কৃত্তিকা, চিংমা খিয়াংয়ের মতো ধর্ষণ-হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে সেসব ঘটনায় জড়িত সকল ধর্ষক-অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে প্রকাশ্যে জনসন্মুখে ফাঁস দেওয়া হোক।

সমাবেশের সভাপতির বক্তব্যে উবাইচিং মারমা বলেন, বিগত সময়ে আসিয়া, তনু, চিংমা-দের ধর্ষণের বিচার যদি এই রাষ্ট্র করতে ব্যর্থ না হতো তাহলে আজকে রামিসার মতো আর কেউ নির্মম ঘটনার শিকার হতেন না। এই সময়ে এসেও ছোট্ট শিশু থেকে শুরু করে ৭০ বছর বয়সী নারীরাও নিরাপদ নয়। শহরের অলি-গলিতে, গ্রামে-গঞ্জে এমনকি নিজ বাড়িতে পর্যন্ত নারী-শিশুরা ধর্ষণ-হিত্যার শিকার হচ্ছে।

তিনি বলেন, নিজের আত্মরক্ষার জন্য নিজেকেই সর্বদা প্রস্তুত রাখতে হবে।

সরকারের প্রতি দাবি জানিয়ে দিন বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশে যে নারী-শিশু ধর্ষণ-হত্যার ঘটনা ঘটছে তা বন্ধের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিন, রামিসাসহ সমতল ও পাহাড়ে ধর্ষণ-হত্যায় জড়িত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত করুন।



This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More