চট্টগ্রামে দুই নারী সংগঠনের বিক্ষোভ-সমাবেশ, বিশেষ আদালতে কল্পনা চাকমার চিহ্নিত অপহরণকারী লে. ফেরদৌস গংদের বিচার দাবি

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬
অবিলম্বে বিশেষ আদালতে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি নারী নেত্রী কল্পনা চাকমার চিহ্নিত অপহরণকারী লে. ফেরদৌস, প্লাটুন কমান্ডার সালেহ আহম্মেদ ও ভিডিপি সদস্য নুরুল হককে সর্বোচ্চ সাজা প্রদানের দাবিতে চট্টগ্রাম নগরীতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে পাহাড়ের দুই নারী সংগঠন হিল উইমেন্স ফেডারেশন ও পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘ।
আজ শুক্রবার (১২ জুন ২০২৬) বিকাল ৪টায় ‘কল্পনা চাকমা অপহরণের ৩ দশক’ উপলক্ষে চট্টগ্রাম নগরীর ডিসি হিল থেকে একটি মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি প্রেস ক্লাবসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে চেরাগি পাহাড় মোড়ে এসে এক সমাবেশে মিলিত হয়।
এতে বৃষ্টি উপেক্ষা করে চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শ্রমিক এলাকা এবং পাহাড়ের বিভিন্ন উপজেলা থেকে প্রায় ৪৫০ জনের অধিক বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজন অংশগ্রহণ করেন।

‘নারী-শিশু ধর্ষণ বন্ধে পাহাড়-সমতলে শিশু রামিসার বিচার প্রক্রিয়া অনুসরণ কর’ শ্লোগানে অনুষ্ঠিত সমাবেশে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সভাপতি নীতি চাকমার সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক রিতা চাকমার সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘের সভাপতি কণিকা দেওয়ান, বাংলাদেশ নারী মুক্তি কেন্দ্রের সংগঠক আসমা আকতার, বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি)-এর কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সোহেল চাকমা, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় সভাপতি জিকো ত্রিপুরা ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সদস্য রেশমী মারমা।

নারী নেত্রী কনিকা দেওয়ান বলেন, কল্পনা চাকমা অপহরণের আজ ৩০ বছর পূর্ণ হল অথচ চিহ্নিত অপহরণকারী লে. ফেরদৌস গংদের এখনো গ্রেফতার করা হলো না। যা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের দ্বিমুখী বিচারব্যবস্থার একটি অন্যতম দৃষ্টান্ত। তিনি বিএনপি সরকারে প্রতি প্রশ্ন রেখে বলেন, ২০১৬ সালে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে সংঘটিত সোহাগী জাহান তনু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা দশ বছর পর বিচার হলে, দোষী সেনা সদস্যদের গ্রেফতার করা হলে ৩০ বছর পরেও কল্পনা অপহরণের বিচার কেন হচ্ছে না?

তিনি আরো বলেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত বিএনপি সরকার অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হবে একমাত্র পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। তিনি বলেন, কল্পনা চাকমা আমাদের সাহস ও অনুপ্রেরণা, কল্পনার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য সেনাবাহিনী কর্তৃক অপহরণের ঘটনা সংঘটিত করা হয়েছে, যার কারণে অপহরণের ঘটনাটিকে বিতর্কিত করার জন্য নানা ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। ১৯৯৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি জেএসএস অস্ত্রসমর্পনের সময় সন্তু লারমা কল্পনা অপহরণের ঘটনাটিকে বিতর্কিত বলে মন্তব্য করেছিলেন, যা সেনা- শাসকগোষ্ঠীরই বয়ান ও কল্পনা অপহরণের ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার একটি নগ্ন দৃষ্টান্ত। তিনি অবিলম্বে কল্পনা চাকমাসহ দেশের নারী-শিশু ধর্ষণ ও হত্যা বন্ধ ও বিচারের দাবি জানান।
আসমা আকতার বলেন, দেশের বহু কিছু পরিবর্তন হয়েছে, সেনাবাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তাদের দায়িত্বেরও নানা পরিবর্তন করা হয়েছে। কিন্তু কল্পনা অপহরণের বিচার হয়নি। তিনি আরো বলেন, ৭১ এ বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের লক্ষ্যে বাংলাদেশের মানুষ লড়াই করেছিল। ’২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে দেশের নারী-পুরুষ, জাতিসত্তাসহ পাহাড়ের বসবাসকারী জনগোষ্ঠীরাও আন্দোলনে নেমেছে, ফ্যাসিস্টের পতনের জন্য বুক পেতে দিয়েছে সকল নাগরিকের নিরাপত্তা পাবার জন্য। কিন্তু অভ্যুত্থানের পরেও দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি।

স্বাধীন রাষ্ট্রে কল্পনা চাকমা অপহরণের বিচার না হওয়ার অভিযোগ করে তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম সেনাশাসনের অধীনে থাকার ফলে দেশে বিচারব্যবস্থার বৈষম্য ও কল্পনা চাকমার ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। যার ফলে ৩০ বছর ধরেও কল্পনা চাকমার বিচার হয়নি।
তিনি আরো বলেন, কল্পনা চাকমা একটি নাম নয়, কল্পনা চাকমা একটা ইতিহাস ও প্রতিবাদের ভাষা। যে কন্ঠ রোধ করলে প্রতিবাদ হবে না, যে কন্ঠ রোধ করলে পাহাড়ের মানুষ আন্দোলন করবে না সেই পথটাই কল্পনা চাকমাকে অপহরণ করে তৈরী করা হয়েছে। তারা ভেবেছিল কল্পনা চাকমাকে অপহরণ করলে তার সংগঠন চলে যাবে, পাহাড়ের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন সংঘটিত হবে না। কিন্তু কল্পনা চাকমা’র কন্ঠ রুদ্ধ করে পাহাড়ের ন্যায্য আন্দোলন দমন করা যায়নি। কল্পনা চাকমা’র মতো লক্ষ কন্ঠ আজ জেগে উঠেছে।
তিনি সমতলে ধর্ষণ, হত্যা বন্ধসহ কল্পনা চাকমা অপহরণের বিচার ও অপহরণকারীদের গ্রেফতারের দাবি করেন।
ছাত্রনেতা সোহেল চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে পুরোনো ফ্যাসিস্ট কায়দায় পাহাড়িদের ওপর দমন-পীড়ন চলছে। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে শাসনব্যবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় খাগড়াছড়ি, গুইমারা দীঘিনালা ও রাঙমাটিতে পাহাড়িদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলা করে, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়ে প্রকাশ্যে অনিক, রুবেল, জুনানসহ অনেককে হত্যা করা হয়েছে কিন্তু কোন বিচার হয়নি।

তিনি বলেন, কল্পনা চাকমার অপহরণ ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার জন্য সেসময়ে ২৪ পদাতিক ডিভিশন সেনা হেলিকপ্টার ব্যবহার করে রাঙামাটিসহ বিভিন্ন জায়গায় কল্পনা চাকমার সন্ধান চেয়ে লিফলেট বিলি করেছিল, কল্পনা চাকমা ভারতের ত্রিপুরায় স্বামীর সঙ্গে বসবাস করছে বলেও প্রপাগাণ্ডা ছড়ানো হয়েছিল, সাইনবোর্ডে মানবাধিকার সংগঠনের নাম দিয়ে সংবাদ সম্মেলনও করা হয়, যা ছিল মূলত সেনাবাহিনী কর্তৃক কল্পনা চাকমা অপহরণের ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার ষড়যন্ত্র। তৎকালীন সেনাপ্রধান লে. জেনারেল মাহবুব কর্তৃক কল্পনা অপহরণের ঘটনাকে হৃদয়ঘটিত ব্যাপার আখ্যা দেওয়ার কারণও ছিল মূলত কল্পনা অপহরণকারী লে.ফেরদৌস গংদের দায়মুক্তি দেয়ার চেষ্টা।
পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর নগ্ন হস্তক্ষেপের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে একজন সেনা সদস্যদের যে ক্ষমতা সমতলে ডিসি, এসপির মধ্যেও সেই ক্ষমতা নেই। প্রতিনিয়ত পাহাড়িদের ওপর খবরদারি, জবরদস্তি ও হেনস্তা করে সেনাসদস্যদের ক্ষমতা পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রদর্শিত হচ্ছে। পাহাড়িদের ওপর দমন-পীড়ন জারী রাখার জন্য তিন পার্বত্য জেলায় প্রশাসনের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে বাঙালিদের পদায়ন করা হয়। অথচ পাহাড়িদের মধ্যেও তিন পার্বত্য জেলার আইনশৃঙ্খলার দায়িত্ব পালন করার জন্য যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি রয়েছে। তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের ওপর আধিপত্যবাদ জারী রাখার জন্য সেনা-শাসকগোষ্ঠী ঠাঙাড়ে বাহিনী সৃষ্টি করে, জেএসএসকে লেলিয়ে দিয়ে আভ্যন্তরীণ বিভেদ ও সংঘাত সৃষ্টি করে অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে প্রতিবন্ধকতা তৈরী করছে। যা একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য হুমকিস্বরুপ। সমতলে যেভাবে বাক স্বাধীনতার চর্চা হয়, যে নিয়মের দ্বারা সাধারণ মানুষ পরিচালিত হয় পাহাড়কে মানুষকেও সেই সুযোগ ও অধিকার দিতে হবে।

তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে জাতীয় রাজনৈতিক সমস্যা উল্লেখ করে আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে উত্তর আয়ারল্যান্ডে বৃটেনের দমন-পীড়ন নীতি ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া ও মধ্য আমেরিকায় কাউন্টার ইন্সার্জেন্সির নীতির ওপর প্রশিক্ষণ নিয়ে এসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পাহাড়িদের ওপর দমন-পীড়ন চালালে, সমতল থেকে ছিন্নমূল বাঙালিদের রেশন দিয়ে, ৫ একর ভূমির প্রলোভন দেখিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসন করলে পাহাড়ের সমস্যা সমাধান হবে না। পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধান করতে হলে পাহাড়িদের মতামত ও দাবীকে গুরুত্ব দিয়ে রাজনৈতিকভাবে পূর্ণস্বায়ত্তশাসন প্রদান করতে হবে।

সভাপতির বক্তব্যে নীতি চাকমা বলেন, ৩০ বছর ধরে কল্পনা চাকমা অপহরণের ঘটনাকে ধামাচাপা দেয়ার জন্য অনেক নাটক হয়েছে। সর্বশেষ, ২০২৪ সালের ২৩ এপ্রিল রাঙামাটি জেলা কোর্ট কর্তৃক কল্পনা চাকমা অপহরণের মামলা বাতিল করে অপহরণকারীদের দায়মুক্তির রায় ছিল নাটকের নগ্ন দৃষ্টান্ত। তিনি এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। একই সাথে তিনি এই নাটকের অবসান ঘটিয়ে তনু ধর্ষণ ও হত্যা এবং রামিসা হত্যার ঘটনায় অভিযুক্তদের গ্রেফতার এবং মৃত্যুদণ্ড শাস্তি দিয়ে যেভাবে বিচারের দৃষ্টান্ত দেখানো হচ্ছে একইভাবে কল্পনা চাকমা অপহরণের চিহ্নিত অপহরণকারী লে. ফেরদৌস, ভিডিপি প্লাটুন কমান্ডার সালেহ আহম্মদ ও সদস্য নরুল হকসহ যারা অপহরণের ঘটনায় জড়িত সকলকে গ্রেফতার ও বিচারের দাবি জানান।


সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
