মতামত

তারেক সরকারের তিন মাস : পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রেক্ষিতে একটি মূল্যায়ন

0


মিল্টন চাকমা, সংগঠক, ইউপিডিএফ



তারেক রহমানের বিএনপি সরকারের বয়স তিন মাস অতিক্রম করার পর, এ সময়ে তার সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কিত যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে সে বিষয়ে পর্যালোচনা করা দরকার। প্রথমে বলা রাখা ভাল, গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের জন্য দলটির বিশেষ কিংবা সাধারণ কোন অঙ্গীকার ছিল না। নির্বাচনী ইশতেহারে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কিছু মামুলি প্রতিশ্রুতি ছিল মাত্র।

নির্বাচনে জনসংহতি সমিতির সন্তু গ্রুপ কোন সমঝোতা ছাড়াই বিএনপিকে অন্ধভাবে সমর্থন দেয়। অপরদিকে ইউপিডিএফ খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পক্ষ নেয়। উল্লেখ্য, বিএনপি সন্তু লারমার আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে সম্পাদিত ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির বিরোধীতা করে লংমার্চ করেছিল এবং এবার নির্বাচনে জয়লাভ করলে উক্ত চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন করবে বলে অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও সন্তু গ্রুপ নির্বাচনে বিএনপিকে সমর্থন দেয়। সে সময় তাদের এই অবস্থান সুবিধাবাদীতা ও দালালি বলে ব্যাপকভাবে সমালোচিত ও নিন্দিত হয়েছিল।

পার্বত্য মন্ত্রণালয়ে দুরভিসন্ধিমূলক নিয়োগ

নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী করে সরকার গঠন করে। মন্ত্রী সভায় রাঙ্গামাটি থেকে নির্বাচিত দিপেন দেওয়ানকে পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদায় স্থান দেয়া হয় এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়। তবে তারেক রহমান একই মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকেও নিয়োগ দেন। তার সরকারের এই পদক্ষেপকে দুরভিসন্ধিমূলক হিসেবে দেখা হয় এবং সমালোচিত হয়। সন্তু গ্রুপ একে পার্বত্য চুক্তির বরখেলাপ বলে মৃদু প্রতিবাদ জানায়। সরকার তাতে ভ্রুক্ষেপ করেনি এবং হেলাল উদ্দিনকে পার্বত্য মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে নেয়নি।

চুক্তি বাস্তবায়নের সুখবর!

৯ এপ্রিল মন্ত্রী দিপেন দেওয়ান পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে সুখবর আসছে বলে ঘোষণা দিলেও এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনও কোন পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। যেখানে চুক্তি স্বাক্ষরকারী আওয়ামী লীগ দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকার পরও চুক্তি বাস্তবায়ন করেনি, সেখানে চুক্তির বিরোধীতাকারী বিএনপি বাস্তবায়ন করবে – সেটা আশা করার মধ্যে কোন বাস্তব ভিত্তি থাকতে পারে না। স্মরণ করা দরকার বিএনপি নির্বাচনের আগে চুক্তি পুনর্মুল্যায়ন করবে বলে ঘোষণা দিয়েছিল।

২০০১ – ২০০৬ সালের মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার সময়ও বিএনপি পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে কোন আগ্রহ দেখায়নি, যদিও দলটি সে সময় কৌশলগত কারণে জেএসএসকে আঞ্চলিক পরিষদের ক্ষমতায় রেখে দিয়েছিল। সুতরাং দিপেন বাবুর সুখবর আসার ঘোষণা সত্বেও পার্বত্য চুক্তি বিষয়ে তারেক রহমান সরকারের পূর্বের অবস্থানের পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

চুক্তি বিষয়ে তারেক সরকারের পূর্বের অবস্থানের পরিবর্তন না হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায় আরও একটি ঘটনায়। গত ২৯ এপ্রিল আমেরিকার নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিরা চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়ে যে তথ্য তুলে ধরে বক্তব্য দেন তা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের বক্তব্যেরই পুনরাবৃত্তি এবং জেএসএসের ভার্সনের ঠিক বিপরীত। কাজেই এর থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না দিপেন বাবুর চুক্তি বাস্তবায়নের সুখবরটা আসলে কী হতে পারে!

মহিলা এমপি নিয়োগ

সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বিএনপি এডভোকেট মাধবী মারমাকে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে মহিলা এমপি মনোনীত করেছে। জানা যায়, জেএসএস সন্তু গ্রুপ তাদের এক নেত্রীকে বিএনপির মনোনীত মহিলা এমপি বানাতে চেয়েছিল। তারা হয়তো ধারণা করে থাকতে পারে, নির্বাচনে বিএনপিকে সমর্থন দেয়ার বিনিময়ে বিএনপি তাদেরকে এই ছাড় দেবে। কিন্তু সেটা না হওয়ায় জেএসএস সন্তু গ্রুপ নিশ্চয়ই নিরাশ হবে।

জেলা পরিষদের নির্বাচন হচ্ছে না

গত ১৬ মে রাঙ্গামাটি শহরের মোনঘর আবাসিক বিদ্যালয় ও কলেজ প্রাঙ্গনে আয়োজিত জাপানি শিক্ষা পদ্ধতি ‘কুমন’ লার্নিং সেন্টারের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে দিপেন দেওয়ান বলেছেন তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন হচ্ছে।

তার মানে জেলা পরিষদের নির্বাচন হচ্ছে না। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণকে আবারও এই পরিষদগুলোতে প্রতিনিধি নির্বাচনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। তারেক রহমানের সরকারও তার পূর্ববর্তী সরকারগুলোর পথেই হাঁটছে। জেলা পরিষদগুলো গঠনের পর থেকেই ক্ষমতাসীন সরকারী দলের ক্যাডারদের রাজনৈতিক পুনর্বাসন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তারেক রহমানও ব্যতিক্রম হতে পারলেন না।

রাজনৈতিক সমাধানের উদ্যোগ নেই

গত তিন মাসে তারেক সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে এমন কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি, যাতে মনে করা যেতে পারে যে, তার সরকার ফ্যাসিস্ট হাসিনার নীতি থেকে সরে এসে ভিন্ন পথে হাঁটছে। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির পরও পার্বত্য চট্টগ্রাম অশান্ত হয়ে রয়েছে। একের পর এক সাম্প্রদায়িক হামলা, ভূমি বেদখল, নারী নির্যাতনের মতো ঘটনা ঘটেছে। কারণ এই চুক্তির মাধ্যমে জনগণের দাবি পূরণ হয়নি, সত্যিকার রাজনৈতিক সমাধান আসেনি।

তারেক রহমান সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণের ঘোষণা দিতে পারতো। কিন্তু তার সরকার সেটা না করে ফ্যাসিস্ট হাসিনার গণবিরোধী নীতিই অব্যাহত রেখেছে। যেমন পূর্বের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ও শাসন এখনও বলবৎ রয়েছে, সেনা অপারেশন, দমন-পীড়ন চালানো হচ্ছে, হাসিনা আমলে সৃষ্ট ঠ্যাঙাড়ে বাহিনীর সন্ত্রাস অব্যাহত রাখা হয়েছে, জেএসএস নেতা সন্তু লারমাকে ব্যবহার করে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত জিইয়ে রাখা হয়েছে। এক কথায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের কোন কিছুই পরিবর্তন হয়নি।

শেষ কথা

তারেক রহমানের উচিত রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার গতানুগতিক ধারা থেকে বেরিয়ে এসে রাষ্ট্রনায়কোচিত দূরদৃষ্টিসম্পন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা। তার জানা উচিত, শরীরের কোন অংশে ক্ষত থাকলে যেমন সেই ক্ষতকে সারিয়ে কোন ব্যক্তিকে সুস্থ করে তোলা হয়, — নচেৎ সেই সামান্য ক্ষতেই তার মৃত্যু হতে পারে – তেমনি পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যার সমাধান করেই সারা দেশের উন্নতি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ সাধন করতে হবে।

সঠিক সময়ে রোগের চিকিৎসা করা না হলে তা যেমন দুরারোগ্য অথবা চিকিৎসার অতীত হয়ে যায়, তেমনি কোন সমস্যাকে দীর্ঘদিন জিইয়ে থাকতে দিলে, সঠিক সময়ে তার সমাধান করা না হলে, তা জটিলতর এমনকি সমাধানের অযোগ্য হয়ে যায়। তাই তারেক রহমানের উচিত সময় থাকতে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করা। (১৮ মে ২০২৬)



This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More