শহীদ ধর্মশিং চাকমার স্মরণে শ্রদ্ধা নিবেদন ও ছাত্র-যুব-নারী সমাবেশ অনুষ্ঠিত

0

মহতী পূণ্যানুষ্ঠান ও সাপ্তাহিক ক্রিয়া সম্পন্ন


রাঙামাটি প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ

শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬

জেএসএস (সন্তু) সশস্ত্র সন্ত্রাসী কর্তৃক হত্যার শিকার হওয়া যুবনেতা শহীদ ধর্মশিং চাকমার স্মরণে তাঁর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন ও ছাত্র-যুব-নারী সমাবেশ করেছে গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম (ডিওয়াইএফ) কেন্দ্রীয় কমিটি।

এছাড়া পরিবারবর্গ ও আত্মীয় স্বজনের আয়োজনে ধর্মশিং চাকমার সদগতি কামনায় মহতী পূণ্যানুষ্ঠানসহ সাপ্তাহিক ক্রিয়া অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়েছে।

আজ শুক্রবার (২৪ এপ্রিল ২০২৬) সকালে রাঙামাটির কুদুকছড়ি উপর পাড়ায় (আবাসিক) ধর্মশিং চাকমার নিজ বাড়িতে এসব অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

প্রথমে সকাল ৮টায় “জুম্মো দিয়ে জুম্মো ধ্বংসের নীলনক্সা বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে এক হও, প্রতিরোধ গড়ে তোল” শ্লোগানে ‌‘শাসকগোষ্ঠীর পোষ্যপুত্র জাতীয় বেঈমান সন্তু লারমা কর্তৃক সশস্ত্র সন্ত্রাসী লেলিয়ে দিয়ে ডিওয়াইএফ-এর সহসভাপতি ধর্মশিং চাকমাকে গুলি করে হত্যা, তার দুই বোনকে আহত করার প্রতিবাদে এবং খুনীদের শাস্তির দাবিতে’ ছাত্র-যুব-নারী সমাবেশে অনুষ্ঠিত হয়।

সমাবেশ শুরুর পূর্বে স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত করে শহীদ ধর্মশিং চাকমার প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক বরুণ চাকমা, ইউপিডিএফ সংগঠক নির্ণয় চাকমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশন কেন্দ্রীয় সদস্য রিপনা চাকমা ও পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক সম্পাদক চয়ন চাকমা। এরপর সদ্য শহীদ ধর্মশিং চাকমাসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে অধিকার প্রতিষ্ঠা লড়াইয়ে সকল বীর শহীদদের স্মরণে শ্রদ্ধা ও সম্মান জানিয়ে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

এরপর গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম(ডিওয়াইএফ)-এর কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক বরুণ চাকমা সভাপতিত্বে ও কেন্দ্রীয় সদস্য প্রিয়তন চাকমা সঞ্চালনায় ছাত্র-যুব-নারী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

সমাবেশে বক্তব্য দেন, ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)-এর সংগঠক নির্ণয় চাকমা, বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি)-এর কেন্দ্রীয় শিল্প ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক চয়ন চাকমা ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন (এইচডব্লিউএফ)-এর কেন্দ্রীয় সদস্য রিপনা চাকমা। স্বাগত বক্তব্য রাখেন গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় সদস্য সুইচিং মার্মা।

এতে জেলা উপজেলার পিসিপি, এইচডব্লিউএফ ও ডিওয়াইএফের নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

স্বাগত বক্তব্যে সুইচিং মার্মা বলেন, অন্যায়-অবিচার, ভূমি বেদখল, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে ও জুম্ম জনগণের ন্যায্য দাবির পক্ষে আপোষহীনভাবে লড়াই সংগ্রামে যুক্ত থাকার কারণে শাসকগোষ্ঠির পোষ্য সন্তু লারমার সন্ত্রাসীদের হাতে সহযোদ্ধা ধর্মশিং চাকমাকে জীবন দিতে হয়েছে। নিজ জাত ভাইয়ের বুলেটে আজ আমরা ধর্মশিং চাকমাকে হারিয়েছি। যেখানে রাষ্ট্রের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই সংগ্রাম করার কথা, সেখানে সন্তু লারমা তার সশস্ত্র বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়ে বার বার  জাত ভাইয়ের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছেন।

তিনি প্রশ্ন করে বলেন, সহযোদ্ধা ধর্মশিং চাকমা অপরাধ কি? জাতীয় সামগ্রিক স্বার্থে নিরলসভাবে জুম্ম জনগণের পক্ষে লড়াই সংগ্রাম করে যাওয়াই কি সন্তু লারমার চোখে অপরাধ? তিনি অবিলম্বে এ পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্তু লারমার লেলিয়ে দেওয়া  চিহ্নিতকারী সন্ত্রাসী গংদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবি জানান।

ইউপিডিএফ সংগঠক নির্ণয় চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে দু’টি ধারায় আন্দোলন বিরাজমান রয়েছে। যার মধ্যে একটি হচ্ছে ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থ করা আর অন্যটি হচ্ছে জাতীয় সামগ্রিক স্বার্থে জুম্মদের অধিকারের পক্ষে লড়াই সংগ্রামের ধারা। এখান থেকে সামগ্রিক স্বার্থে লড়াইকামী ধারাটিকে অবলম্বন করে জুম্ম জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।


তিনি আরো বলেন, আজ পর্যন্ত পাহাড়ে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের মাত্রা এতটুকু চলার পিছনে সন্তু লারমাই একমাত্র দায়ী। তিনি চাইলে এই মুহুর্তেই এই সংঘাত বন্ধ করতে পারেন। কিন্তু তাকে শাসকগোষ্ঠির এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য সংঘাত জিইয়ে রেখেছেন।

তিনি বলেন, জেএসএস লড়াই-সংগ্রামের কথা বলে জুম্ম জনগণকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এক সময় জুম্মরা নিজেদের জায়গা-জমি বন্দোবস্তি করতে চাইলে তাতে তারা বাধা দিয়েছে। যার ফলে আজ জুম্মদের হাতে বন্দোবস্তির কাগজপত্র না থাকায় ভূমি বেদখলের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে।   

তিনি আঞ্চলিক পরিষদের বাৎসরিক কোটি টাকার বরাদ্দ দিয়ে কয়জন উপকৃত হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং সেই সরকারি বরাদ্দ কোথায় যাচ্ছে তার জবাদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

নির্ণয় চাকমা আরো বলেন, সময়ের প্রয়োজনে ইউপিডিএফ গঠন হয়েছে বলে পাহাড়ে এখনো আন্দোলন সংগ্রাম চলছে। যার কারণে রাষ্ট্র ভয় পেয়ে সন্তু লারমাদের মতো দালালদের আন্দোলকারী শক্তির বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছে। ধর্মশিং চাকমার মতো নিরস্ত্র যুবনেতাদের হত্যার মিশনে নেমেছে। কতটুকু রাজনৈতিক দেউলিয়া হলে একজন নিরস্ত্র মানুষকে এভাবে বর্বরোচিত হামলা করে হত্যা করতে পারে?

তিনি বলেন, শহীদ ধর্মশিং চাকমার এ মহান আত্মত্যাগ কখনো বৃথা যাবে না। তবে তার অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন তখনই স্বার্থক হবে, যখন আমরা সামগ্রিক স্বার্থকে উপলব্ধি করবো এবং ত্যাগের মানসিকতা লালন করবো।

তিনি ধর্মশিং চাকমার লালিত স্বপ্ন, চেতনা, নীতি-আদর্শ ধারণ করে জাতীয় মুক্তির আন্দোলনে সামিল হওয়ার জন্য ছাত্র-যুব-নারী সমাজের প্রতি আহ্বান জানান। একই সাথে তিনি ধর্মশিং চাকমাকে হত্যার সাথে জড়িত সন্তু লারমার সন্ত্রাসীদের অবিলম্বে গ্রেফতার ও শাস্তির দাবি জানান।

ছাত্রনেতা চয়ন চাকমা বলেন, গত ১৭ এপ্রিল সকাল ৬:১৫টার সময় জেএসএস (সন্তু)-এর সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা ন্যাক্কারজনক ও কাপুরুষোচিতভাবে সশস্ত্র হামলা নিরস্ত্র যুবনেতা ধর্মশিং চাকমাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। সন্ত্রাসীরা তাকে হত্যা করে ক্ষান্ত হয়নি, তার আপন ২ বোনকেও গুলি করে গুরুতর আহত করেছে। হত্যাকারীরা চিহ্নিত থাকা সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত প্রশাসন তাদের গ্রেফতারে কোন পদক্ষেপ নেয়নি। সন্ত্রাসীরা প্রশাসনের নাকের ডগায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। এতে স্পষ্ট হয় যে, ধর্মশিং চাকমা হত্যার পরিকল্পনায় সেনা-গোয়েন্দারা জড়িত রয়েছে।

তিনি ধর্মশিং চাকমাকে স্মরণ করে বলেন, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সকল অন্যায়-অবিচার, নিপীড়ন-নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামনের সারিতে থেকে প্রতিবাদ করে গেছেন সহযোদ্ধা ধর্মশিং চাকমা। এর আগে ২০১৮ সালে তিনি সেনাবাহিনীর সৃষ্ট বর্মা গংদের হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছিলেন। কিন্তু তারপরও তিনি দমে যাননি।

তিনি বলেন, ধর্মশিং চাকমা সকল রক্তচক্ষুকে উপেক্ষ করে লড়াইয়ের অকুতোভয় সহযোদ্ধা ছিলেন। তার সাহস, আদর্শ, নীতি শৃঙ্খলা আমাদের প্রজন্ম হতে প্রজন্ম অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। ঘাতকরা তার জীবনকে থামিয়ে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু চেতনা, আত্মত্যাগকে তারা হত্যা করতে পারেনি।

এইচডব্লিউএফ নেত্রী রিপনা চাকমা বলেন, নিরস্ত্র একজন মানুষকে এত নৃসংশভাবে হত্যা করা কোন রাজনৈতিক দলের নীতি আদর্শ হতে পারে না। চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের কথা বলে আজ পর্যন্ত সহযোদ্ধা ধর্মশিং চাকমার মতো শত শত প্রাণ কেড়ে নিয়েছে সন্তু লারমা। এর জন্য একদিন জনগণের কাঠগড়ায় তার বিচার হবে।

তিনি ধর্মশিং চাকমাকে স্মরণ করে বলেন, নিঃস্বার্থ ও নিরলসভাবে সামগ্রিক স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে সংগঠন তথা জনসেবামূলক কাজ করে গেছেন ধর্মশিং চাকমা। আমরা দেখেছি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের সেনা নিপীড়ন-নির্যাতন প্রতিবাদে সামনে ছিলেন। তাই কুদুকছড়ি এলাকাবাসী গর্বের সাথে স্মরণ করবে শহীদ ধর্মশিং চাকমাকে।

তিনি আরো বলেন, সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে সন্ত লারমা আজ পর্যন্ত দিয়ে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত জিইয়ে রেখেছেন। আঞ্চলিক পরিষদের গদি রক্ষার্থে সন্তু লারমা জাতির কথা ভুলে জাত ভাইকে হত্যার নির্দেশ দিয়ে গদফাদারের ভুমিকা পালন করছেন। এই আঞ্চলিক পরিষদের গদি রক্ষার্থে সন্তু লারমার হাতে আর কত নিরীহ মানুষকে বলি হতে হবে?

তিনি সন্তু লারমার ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে নারী, পুরুষ, ছাত্র, যুবক সকলকে আন্দোলনে সামিল হওয়ার আহ্বান জানান।

সভাপতির বক্তব্যে বরুন চাকমা বলেন, শহীদ ধর্মশিং চাকমার মৃত্যু কোন সাধারণ মৃত্যু নয়। সন্তু লারমার সন্ত্রাসীরা বন্দুকের গুলি দিয়ে সহযোদ্ধা ধর্মশিং চাকমা জীবন স্তব্ধ করে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার চেতনা, নীতি আদর্শ আমাদের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

তিনি ধর্মশিং চাকমাকে স্মরণ করে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে দুঃখী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা লড়াইয়ে পাশাপাশি ধর্মংশিং চাকমা জনসেবামূলক কাজ করে গেছেন। শুধু সহযোদ্ধা ধর্মশিং চাকমা নয়, ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে অনেক নেতা-কর্মী, সমর্থক, শুভাকাঙ্ক্ষীকে আমরা হারিয়েছি। তাদের বুকে লালিত স্বপ্ন ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামে অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। তাদের এই মহান আত্মত্যাগ বৃথা যেতে পারে না।

তিনি বলেন, ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের মূল হোতা হলেন সন্তু লারমা। সন্তু লারমা চাইলে এখনই এই সংঘাত বন্ধ করতে পারেন, জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারেন। কিন্তু তা না করে শাসকগোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়ন ও তার আঞ্চলিক পরিষদের ক্ষমতা ধরে রাখতে সন্তু লারমা এই সংঘাত জিইয়ে রেখেছেন। তাই এই সংঘাত বন্ধের জন্য ছাত্র-যুব-নারী সমাজকে সোচ্চার হতে হবে।

তিনি অবিলম্বেব ধর্মশিং চাকমার হত্যাকারী জেএসএস(সন্তু) সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারপূর্বক বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

মহতী পূণ্যানুষ্ঠান ও সাপ্তাহিক ক্রিয়া অনুষ্ঠান

সমাবেশে শেষে সকাল ৯:২০টায় ধর্মশিং চাকমার সদগতি কামনায় মহতী পূণ্যানুষ্ঠানের আয়োজন করে পরিবারবর্গ ও আত্মীয়-স্বজনরা। এতে ভিক্ষু সংঘ ধর্ম দেশনা প্রদান করেন। এলাকার সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ এ পূণ্যানুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। এরপর শেষ পর্ব তার সাপ্তাহিক ক্রিয়া বা শ্রাদ্ধানুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়।




উল্লেখ্য, গত ১৭ এপ্রিল ভোর সকালে ঝিমিত চাকমা ও অটল চাকমার নেতৃত্বে জেএসএস (সন্তু)-এর একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী কুদুকছড়ি উপর পাড়ায় (আবাসিক) হানা দিয়ে গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ধর্মশিং চাকমাকে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করে ও তার দুই বোন কৃপা সোনা চাকমা ও ভাগ্য শোভা চাকমাকেও গুলি করে মারাত্মক জখম করে।



This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More