‘আগ্রাসনের শিকার নিরীহ শিশুদের আন্তর্জাতিক দিবসে’ রাঙামাটির কুদুকছড়িতে শিশু র‌্যালি

0

রাঙামাটি প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬

“আগ্রাসনের শিকার নিরীহ শিশুদের আন্তর্জাতিক দিবস” উপলক্ষে খুনী-ধর্ষক নরপশুদের ফাঁসি ও নারী শিশুদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবিতে রাঙামাটির কুদুকছড়িতে শিশু র‌্যালি করেছে অগ্রণী শিশু-কিশোর কেন্দ্র (এসিসি)।

আজ বৃহস্পতিবার (৪ জুন ২০২৬) সকাল ১০.৩০টায় কুদুকছড়ির নির্বাণপুর বিহার গেইট থেকে শিশু র‌্যালি শুরু হয়ে রাঙামাটি – খাগড়াছড়ি সড়ক হয়ে বড় মহাপূরণ উচ্চ বিদ্যালয় গেইটে গিয়ে সমাবেশে মিলিত হয়। র‌্যালিতে কুদুকছড়ির বিভিন্ন জায়গা থেকে দেড় শতাধিক নারী-শিশু, ছাত্র-ছাত্রী অংশগ্রহণ করেন।

র‌্যালি পরবর্তী সমাবেশে অগ্রণী শিশু-কিশোর কেন্দ্র (এসিসি) সদস্য রিয়া চাকমার সভাপতিত্বে ও সদস্য ইতি চাকমা সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন শ্রদ্ধা চাকমা। এতে সংহতি জানিয়ে আরো বক্তব্য রাখেন বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি)-এর রাঙামাটি জেলা সাধারণ সম্পাদক দিপায়ন চাকমা ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের রাঙামাটি জেলা সাধারণ সম্পাদক রিতা চাকমা।

র‌্যালি ও সমাবেশে অংশগ্রহণকারী শিশু, কিশোর-কিশোরীরা “আমরা ভয়-ভীতিহীন পরিবেশ চাই; স্কুলভবন সেনা ছাউনি বানানো চলবে না; উদ্যত রাইফেল-বেয়নেট সরিয়ে নাও, আমাদের খেলতে দাও; প্রলোভনে শিশুদের ধর্মান্তর বন্ধ করতে হবে; সেনা কর্তৃক দুর্বৃত্ত, ধর্ষক ও খুনীদের প্রশ্রয়দান বন্ধ কর; জুম্মো দিয়ে জুম্মো ধ্বংসের খেলা বন্ধ কর; End the conflict, save the children; Stop the silence, speak up for the children.’ ইত্যাদি দাবি সম্বলিত প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন।

সমাবেশে স্বাগত বক্তব্যে শ্রদ্ধা পূর্ণা চাকমা বলেন, “আমাদের নিরাপদ, ভয়হীন ও সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার লক্ষ্যে আজকের এই আন্তর্জাতিক দিবসে আমাদের রাস্তায় নামতে হয়েছে। আমাদের মা-বাবাদের করের টাকায় পরিচালিত রাষ্ট্র আমাদের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা থাকলেও রাষ্ট্র নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। আমরা শিশু-কিশোররা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হচ্ছি।”

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের উপর হত্যা-ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটছে। ২০২৪ সালে  আমাদের সহপাঠী ৫ম শ্রেণীর শিক্ষার্থী ভানথাংপুই বমকে সেনাবাহিনীর অভিযানে এলোপাতাড়ি গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। আমরা তার কোন বিচার পাইনি। ২০১৮ সালে ৫ম শ্রেণীর ছাত্রী কৃত্তিকা ত্রিপুরা পূর্ণাকেও ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। তার সুষ্ঠু বিচার আমরা এখনো পাইনি। সম্প্রতি বান্দরবানের ৫ বছর বয়সী ত্রিপুরা শিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে। সেই ধর্ষককে বাঁচানোর জন্য প্রকাশ্য রাষ্ট্রীয় বাহিনী বিজিবি পক্ষপাতিত্ব করেছে। যেখানে ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জন্য রাষ্ট্রীয় বাহিনী সহযোগিতা করার কথা সেখানে ধর্ষকদের প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে।’

সংহতি বক্তব্যে দীপায়ন চাকমা, ১৯৮২ সালে ইসরায়েল ও লেবাননের যুদ্ধের সময় হাজার হাজার নিরীহ শিশুদের হত্যা করা হয়। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘ আজকের দিবসটির সূচনা করে, যাতে শিশুরা নিরাপদ ও সুরক্ষা পায়। কিন্তু এখনো বিশ্বে যুদ্ধ, সহিংতার কারণে শিশুরা নিরাপত্তাহীনতা ও আগ্রাসনের শিকার হচ্ছে। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামও তার কোন ব্যতিক্রম নয়।  

তিনি বলেন, ২০২৪ সালে বান্দরবানে ভানথাংপুই বম ৫ম শ্রেণির ছাত্রকে কেএনএফ সদস্য সাজিয়ে সেনাবাহিনী গুলি করে হত্যা করে। সম্প্রতি গত ২৪ মে বান্দরবানের থানচিতে ৫ বছরের এক ত্রিপুরা শিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের ৫ মে তিন সন্তানের জননী চিংমা খেয়াং নামে এক নারীকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। একই বছর সেপ্টেম্বর মাসে খাগড়াছড়ি সদরের সিঙ্গিনালায় পাহাড়ি কিশোরীকে ধর্ষণের বিচার দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে সেনা-সেটলার কর্তৃক পাহাড়িদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলা চালিয়ে গুইমারায় তিনজন পাহাড়ি যুবককে হত্যা ও রামেসু বাজার পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনার কোন বিচার হয়নি। এই ঘটনাগুলো সেদিনের ইসরায়েল ও লেবানন যুদ্ধে হাজার হাজার নিহত শিশুদের কথা মনে করিয়ে দেয়।

তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম যেন এক ফিলিস্তিন- লেবানন। এখানে দশকে পর দশক ধরে সেনাশাসন জারি রেখে সেনাবাহিনী কর্তৃক দমন-পীড়ন, নারী-শিশু ধর্ষণ, হত্যা, গুমসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে চলেছে। বর্তমানে সেনা অভিযানের নামে স্কুলঘর সেনাছাউনি বানিয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদানে ব্যাঘাত সৃষ্টি করা হচ্ছে। সাধারণ জনগণের ঘরবাড়িতে তল্লাশির নামে নারী-শিশুদের আতঙ্কের মধ্যে রাখা হয়েছে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের শিশুরা জন্মলগ্ন থেকেই সেনা নিপীড়নের মধ্যে বড় হতে বাধ্য হচ্ছে। নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে তারা বেড়ে উঠতে পারছে না।

রিতা চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে নারী শিশুরাই বেশি নিরাপত্তাহীন। স্কুলে গেলে  শিক্ষক কর্তৃক ধর্ষণের শিকার হতে হয়, হাটে-বাজারে, বাড়িতে কিংবা পানি আনতে গিয়ে নারী শিশুদের ধর্ষণের শিকার হতে হয়। ধর্ষণের ঘটনায় কোন সুষ্ঠু বিচার হয় না। মেডিক্যাল রিপোর্টের ওপর গোয়েন্দা সংস্থার গোপন নিষেধাজ্ঞা থাকায় পাহাড়ি নারী-শিশু ধর্ষণের সঠিক রিপোর্ট পাওয়া যায় না। অন্যদিকে ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দিয়ে রাখার জন্য রাষ্ট্রীয় বাহিনী, প্রশাসন নানা ষড়যন্ত্র করে থাকে। ফলে ধর্ষকরা পার পেয়ে যায়।

তিনি বলেন, সমতলে তনু হত্যারকারীদের গ্রেফতার ও বিচারের পদক্ষেপ নেওয়া হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৯৯৬ সালে ১২ জুন কল্পনা চাকমার চিহ্নিত অপহরণকারী  লে. ফেরদৌস গংদের এখনো বিচারের আওতায় আনা হয়নি। 

রাষ্ট্র আমাদের ভয়-ভীতিহীন নিরাপদ পরিবেশ তৈরী করতে ব্যর্থ হয়েছে উল্লেখ করে রিতা চাকমা বলেন, আমাদের উপর প্রতিনিয়ত ধর্ষণ, হত্যা ও নানা ধরনের আগ্রাসন চালানো হচ্ছে। আমাদেরকে জাতিগতভাবে ধ্বংস করার জন্য আগ্রাসন চালানো হচ্ছে। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সেনা ছাউনীতে পরিনত করা হয়েছে। যা আমাদের নির্ভয়ে শিক্ষাগ্রহণ করতে বাধাগ্রস্ত করছে। বান্দরবানসহ বিভিন্ন জায়গায় প্রলোভন দেখিয়ে শিশু-কিশোরদের ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

সমাবেশ থেকে বক্তারা, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা রাজনৈতিকভাবে সমাধান করে  নিরাপদ, ভয়-ভীতিহীন পরিবেশ সৃষ্টি করা এবং এযাবত সংঘটিত সকল ধর্ষণ-হত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান। একই সাথে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিক আগ্রাসন বন্ধে পদক্ষেপ নিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান।



This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More