২০২৪ সালের ৬ আগস্ট রাঙামাটিতে সমাবেশে যাওয়া ছাত্র-জনতার ওপর যেভাবে হামলা চালিয়েছিল জেএসএস-সেনা-সেটলাররা

0
হামলায় আহতদের মধ্যে কয়েকজন। ফাইল ছবি


রাঙামাটি প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২৬

‘বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর নেতৃত্বে সংগঠিত গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরের দিন ৬ আগস্ট ২০২৪ রাঙামাটিতে আয়োজিত এক গণসমাবেশে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতার ওপর জেএসএস (সন্তু), সেনাবাহিনী ও সেটলার বাঙালিরা পৃথক পৃথকভাবে তিন স্থানে হামলা চালায়। এতে অন্তত ৬২ জন আহত ও ১১ জন অপহরণের শিকার হন।

যেভাবে হামলা করা হয়েছিল

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরবর্তী দেশে গঠিত হতে হওয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ‘ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ’ এর ব্যানারে চার দফা দাবিতে রাঙামাটি শহরের জিমনেসিয়াম মাঠে ৬ আগস্ট ২০২৪ বিকাল ৩ টায় উক্ত গণসমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল।

তাদের দাবিগুলো ছিল- পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনাশাসন প্রত্যাহার, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী সকল দলের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা, ফ্যাসিস্ট সরকারের অধীনে পরিচালিত সকল গণহত্যার বিচার ও রাজবন্দীদের মুক্তি।

সেদিন সমাবেশে অংশ নিতে যাওয়া লোকজনের একটি অংশ নৌপথে ও আরেকটি অংশ সড়ক পথে রওনা দেন।

প্রথম অংশটি জেলা শিল্পকলা একাডেমী এলাকায় বোটঘাটে পৌঁছলে আগে থেকে লাঠিসোটা হাতে সেখানে অবস্থান করা জেএসএস ও তার সমর্থিত ছাত্র, যুব ও নারী সংগঠনের লোকজন বোটগুলো পাড়ে ভেড়াতে বাধা প্রদান করে। এক পর্যায়ে তারা বোটে থাকা লোকজনের ওপর গুলতি-ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। এতে সেখানে কয়েকজন আহত হন। পরে তাদের আক্রমণ বন্ধ না হওয়ায় সমাবেশে যাওয়া ছাত্র-জনতা বোট থেকে নেমে তাদেরকে প্রতিরোধ করে। এতে রাজবাড়ি স’মিল এলাকায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। প্রতিরোধের মুখে জেএসএস সন্ত্রাসীরা সেখান থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

শিল্পকলা একাডেমী এলাকায় বোটঘাটে জেএসএস সন্ত্রাসীদেরকে সমাবেশে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতার ওপর গুলতি ও ইট-পাটকেল ছুঁড়ে হামলা করতে দেখা যাচ্ছে। ফাইল ছবি 

খবর পেয়ে পরে সেনাবাহিনীর একটি দল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে গিয়ে উপস্থিত হয়। এমতাবস্থায় সমাবেশে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতা রাজবাড়ি এলাকায় সড়কে গিয়ে পৌঁছে এবং সেখানে ব্যানার নিয়ে সমাবেশের জন্য দাঁড়ায়। এরপর দু’পক্ষকে থামাতে সেনাবাহিনীর সদস্যরা সেখানে মাঝখানে দাঁড়িয়ে অবস্থান নেয়। কিন্তু বক্তারা কথা বলা শুরু করতে না করতেই পেছন দিক থেকে সেনাবাহিনীর আরেকটি দল এসে ছাত্র-জনতার ওপর অতর্কিত হামলা ও লাঠিপেটা করে শুরু করে ও ধাওয়া দেয়। সেখানে আরো বেশ কয়েকজন আহত হন। জেএসএস ও সেনাবাহিনীর দু’দফা হামলায় সেখানে নারীসহ অন্তত ২৬ জন আহত হন।

 সেনাবাহিনীর সদস্যরা সমাবেশ করতে বাধা প্রদান করছে। ছবিটি রাজবাড়ি এলাকা থেকে তোলা। ফাইল ছবি

অপরদিকে, কুদুকছড়ি এলাকার দিক থেকে সমাবেশে অংশগ্রহণ করতে যাওয়া লোকজনকে সেনাবাহিনী মানিকছড়িতে আটকিয়ে দেয়। আর কাউখালী থেকে সমাবেশ যোগদান করতে যাওয়া লোকজনকে ঘাগড়া সাবজোনে গাড়িগুলো আটকিয়ে দেয়া হয়। পরে সেখান থেকে তাদের গাড়িগুলো ছেড়ে দেওয়া হলে কুদুকছড়ি ও কাউখালীর দিক থেকে যাওয়া লোকজন মিলিত হয়ে রাঙামাটি শহরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। তাদের গাড়ি বহর বেতারকেন্দ্র এলাকায় পৌঁছলে আগে থেকে সেখানে মারমুখি অবস্থান নিয়ে থাকা জেএসএস ও তার সমর্থিত ছাত্র-যুব-নারী সংগঠনভুক্ত সন্ত্রাসীরা তাদেরকে রাঙামাটি শহরের দিকে যেতে বাধা প্রদান করে। সেখানে তাদের সাথে ছাত্র-জনতার কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে জেএসএস সন্ত্রাসীরা গাড়িতে থাকা লোকজনের ওপর হামলা চালায়। তারা গাড়ি ভাংচুর করে। এতেও আরও অনেকে আহত হন।

পরে লোকজন গাড়িযোগে সেখান থেকে ফিরে আসার সময় মানিকছড়িতে আরেকদফা হামলা চালায় সেটলার বাঙালিদের একটি দল। এতে একজন নারী শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন। পরে তাকে চট্টগ্রামে হাসপাতালে ভর্তি করে বেশ কিছু সময় চিকিৎসা করাতে হয়।

ত্রিমুখী এ হামলায় সেদিন সমাবেশে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অন্তত ৬২ জন আহত হন এবং জেএসএস সন্ত্রাসীরা ১১ জনকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। অবশ্য কয়েকদিন পর জনপ্রতিনিধি ও মুরুব্বীদের মধ্যস্থতায় তারা অপহৃতদের ছেড়ে দেয়।  

ত্রিমুখী এই হামলার ঘটনাটি ২ বছর পূর্ণ হলেও এ ঘটনায় জড়িত কাউকে আইনের আওতায় আনা হয়নি।



This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More