পার্বত্য চট্টগ্রামে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি পিসিপির

0

নিজস্ব প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
সোমবার, ১৮ মে ২০২৬

সেনাশাসন ‘অপারেশন উত্তরণ’ বন্ধ ও সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ(পিসিপি)।

সংগঠনটির ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রচারিত এক লিফলেটে এ দাবি জানানো হয়েছে। পিসিপি’র কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগ থেকে এ লিফলেটটি প্রকাশ করা হয়। আগামী ২০ মে ২০২৬ সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার ৩৭ বছর পূর্ণ হবে।  

লিফলেটে বলা হয়, … “পার্বত্য চট্টগ্রাম হলো সেনা ছাউনিতে ভরা একটি খোলা কারাগার। এখানে চলছে অপারেশন উত্তরণের নামে সেনা দমন-পীড়ন, অভিযান ও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড নেই ন্যূনতম গণতান্ত্রিক পরিবেশ। অথচ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে বর্তমানে দেশে নির্বাচিত বিএনপি সরকার ক্ষমতায়। নির্বাচিত হলেই সরকার যে গণতান্ত্রিক হয় না সেটা গত ৪ মাসে বিএনপি অসংখ্য প্রমাণ দেখিয়েছে। একটা সরকার কতটা গণতান্ত্রিক, অর্ন্তভুক্তিমূলক ও জনবান্ধব সেটা সংখ্যালঘু জাতি, নারী ও নিপীড়িত জনগণের দিকে তাকালে ভালোভাবে বোঝা যায়। রাঙামাটির জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নাজমা আশরাফী গত ৬ এপ্রিল ২০২৬ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের আদেশে চাকমা রাণী ও মানবাধিকার কর্মী ইয়েন ইয়েনের বিরুদ্ধে ‘‘আর্ন্তজাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ সরকার ও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অসত্য ও বিভ্রান্তিকর অভিযোগ উত্থাপনপূর্বক অপপ্রচার’ চালানোর অভিযোগ তুলে চিঠি দিয়েছেন, যা মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ ও সংবিধান পরিপন্থী। এই চিঠি এমন সময় দেয়া হলো যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে শতভাগ মানবাধিকার রক্ষা সম্ভব নয়’ বলে মন্তব্য করে প্রকারান্তরে নিরাপত্তা বাহিনীকে মানবাধিকার লঙ্ঘনে উৎসাহিত করেছেন। অথচ তিনি নিজেই ফ্যাসিস্ট আওয়ামী আমলে গুমের মতো চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছিলেন। তাঁর ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য প্রমাণ করে যে, ফ্যাসিস্ট বিদায় হলেও ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা রয়ে গেছে এবং তাঁরা এখন নিজেরাই নব্য ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠেছেন।

“পার্বত্য চট্টগ্রামে এই নব্য ফ্যাসিবাদ কায়েমে তাদের সাথে জুনিয়র পার্টনার হিসেবে যুক্ত হয়েছেন বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের বিশ্বস্ত সহযোগি ফ্যাসিস্ট সন্তু লারমা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সন্তু নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির বিএনপিকে নির্লজ্জ সমর্থন সেটাই প্রমাণ করে। এই সমর্থনের বিনিময়ে সন্তু লারমা তার আঞ্চলিক পরিষদের গদি রক্ষা ও ভ্রাতৃ হত্যার লাইসেন্স নবায়ন করতে সক্ষম হয়েছেন। ফলে গত ১৭ এপ্রিল ২০২৬ রাঙামাটি সদর উপজেলায় গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় নেতা ধর্মশিং চাকমাকে সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় জেএসএস সন্ত্রাসীরা ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করে। তার আগে তারা পানছড়িতে ইউপিডিএফ সংগঠক আপন ত্রিপুরাকে খুন করে।

“ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাস দমনের নামে সেনাবাহিনী বম জাতিসত্তাকে নির্মূলীকরণের প্রজেক্ট হাতে নিয়েছিল। বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলেও তা অব্যাহত রয়েছে। বিনা বিচারে দুই বছর ধরে আটকে রাখা হয়েছে নারী-শিশুসহ ৫৭ জন বম ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর নাগরিককে। পাহাড়িদের নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ, জোরপূর্বক ধর্মান্তরিতকরণ, জীবন-জীবিকা, পানি ও খাবারের উৎস নষ্ট করা, বন, পাথরসহ প্রাকৃতিক সম্পদ লুন্ঠন ও ধ্বংস এবং গুলি করে নির্বিচারে হত্যাসহ দমনপীড়নের স্টিমরোলার এখনো চলছে পাহাড় জুড়ে। বিগত অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের সময়ে ১৮-২০ সেপ্টেম্বর ২০২৪ দিঘীনালা, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিতে এবং ২৭-২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ খাগড়াছড়ি সদর ও গুইমারায় সংঘটিত সাম্প্রদায়িক হামলা ও হত্যাকান্ডের কোনো সরকারি তদন্তের প্রতিবেদন আজও প্রকাশ করা হয়নি। অপরাধীরা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। অথচ বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণও সামিল হয়েছিলেন। পাহাড়ি জনগণ হাসিনার পাতানো নির্বাচন বয়কট করে, যা সে সময় বিএনপির কাছে প্রশংসিত হয়েছিল। অথচ আজ ক্ষমতায় এসে তারা সেসব বেমালুম ভুলে গেছে।

“আসলে বিএনপির মতো ধনিক শ্রেণীর গণবিরোধী দলগুলোর চরিত্র হলো এমনই। জনগণকে সবসময় মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে তারা অত্যন্ত দক্ষ ও সুচতুর। বিএনপি নেতারা এখন প্রতিদিন ‘রেইনবো নেশনের’ বুলি কপচিয়ে ও ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের’ মন্ত্র জপে সংখ্যালঘু জাতিসত্তার জনগণকে সম্মোহিত করতে চাইছে। অথচ দেশের বিদ্যমান সংবিধানে এখনো বাঙালি বাদে অন্য কোনো জাতির, ভাষার কিংবা তাদের রাজনৈতিক অধিকারের স্বীকৃতি নেই। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের মতো বিএনপি বর্তমানে সংখ্যালঘু দরদী, ধর্মনিরপেক্ষ ও নাগরিক অধিকারের পক্ষে একমাত্র বিকল্প হিসেবে নিজেকে জাহির করার চেষ্টা করলেও প্রকৃত অর্থে তাদের আদর্শ ও নীতির সাথে উগ্র ডানপন্থীদের তেমন তফাত নেই।”

এতে আরও বলা হয়, …“পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্তির মূল কারণ হলো সেনাশাসন, যার লক্ষ্য হলো এই অঞ্চলের জুম্ম জনগণের জাতীয় অস্তিত্ব ধ্বংস করে দেয়া। সে কারণে আমরা দেখি, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এখানে তাই করছে, যা ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল ফিলিস্তিনে করেছে। পাহাড়কে মানবাধিকার লঙ্ঘনের স্বর্গরাজ্য বানিয়ে, সেখানে চরম অশান্তি জিইয়ে রেখে, সেনাবাহিনী বিদেশে শান্তি রক্ষার মিশনে যায়। সরকার একদিকে স্বীকার করছে পার্বত্য চট্টগ্রামে শতভাগ মানবাধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, অথচ সেই মানবাধিকারের পক্ষে যারা কথা বলতে চায় তাদের মুখও বন্ধ করে দিচ্ছে। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের ভিতরে সোহাগী জাহান তনু ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় অভিযুক্ত সেনা সদস্যদেও গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে এবং আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। অথচ সারা দেশে আলোচিত কল্পনা চাকমা অপহরণে অভিযুক্ত লে. ফেরদৌস ও তার সহযোগীদের আদালত দায়মুক্তি দিয়েছে। এ এক উৎকট বৈষম্য, এক দেশে দুই নীতি। আশির দশকে সেনা জেনারেলরা ঘোষণা করতেন ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ নয়, মাটি চাই’। সেই নীতি আজও বলবৎ আছে, আজও পাহাড়ে ‘জাতিগত নির্মূলীকরণ’ চলছে।”

লিফলেটে বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রতি ৬ দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলো হলো-

১. সমতলের মতো পাহাড় থেকেও সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিন। অঘোষিত সেনাশাসন প্রত্যাহার করে পার্বত্য চট্টগ্রামে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে দিন।

২. সেনা মদদপুষ্ট ঠ্যাঙাড়ে সন্ত্রাসী গ্রুপদের ভেঙে দিন, রাজনৈতিক হত্যাকান্ড বন্ধ করুন। বিনা বিচারে দীর্ঘ দুই বছরের অধিক কারাবন্দী বমদের মুক্তি দিন।

৩. পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের ন্যায্য দাবি পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন মেনে নিন। অবিলম্বে ইউপিডিএফ নেতা আনন্দ প্রকাশ চাকমা, প্রদীপ চাকমাসহ সকল রাজবন্দিদের মুক্তি দিন।

৪. সকল মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা অধিকারসহ পিসিপি’র শিক্ষা সংক্রান্ত পাঁচ দফা পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন করুন।

৫. অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে সংঘটিত খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও গুইমারায় সাম্প্রদায়িক হামলা, লুটপাট ও হত্যাকান্ডসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত সকল সাম্প্রদায়িক হামলা ও গণহত্যার বিচার করুন। অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জাহাঙ্গীরকে গ্রেফতার করুন।

৬. কল্পনা চাকমার অপহরণকারী লে. ফেরদৌস গংদের গ্রেপ্তার ও বিচার করুন।

* প্রচারিত লিফলেটটি নীচে দেওয়া হলো:   




This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More