বর্মছড়িতে সেনা অভিযানের আপডেট: আটক দুই ব্যক্তিকে অমানুষিক নির্যাতন, নারীদের প্রতিবাদের মুখে আটক ব্যক্তিদের মুক্তি

0

বর্মাছড়ি প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬

খাগড়াছড়ির লক্ষীছড়ি উপজেলার বর্মাছড়িতে গত মধ্যরাত থেকে আজ শনিবার (৩ অক্টোবর ২০২৬) সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ঠ্যাঙাড়ে দুর্বৃত্তদের সাথে নিয়ে সেনাবাহিনী জনহয়রানি ও নিপীড়নমূলক এক অভিযান চালিয়েছে।

অভিযানকালে সেনারা এলাকার দুই বাসিন্দার বাড়ি ঘেরাও করে তাদেরকে আটক ও তাদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালায়। এছাড়া তারা বর্মাছড়ি বাজারগামী লোকজনের কাছ থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নেয় বলেও অভিযোগ উঠেছে।

পরে এলাকার নারীদের প্রতিবাদের মুখে সকাল ১০টার দিকে সেনারা আটক দুই ব্যক্তিকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। 

ভুক্তভোগী দুই ব্যক্তি হলেন- দেওয়ান পাড়ার কার্বারী কালাচাঁন চাকমার ছেলে বসন্ত চাকমা ও বৈদ্য পাড়ার হাজাছড়ি গ্রামের মহেন্দ্র চাকমার ছেলে বৃষ কুমার চাকমা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত মধ্যরাত ১:০০টার সময় লক্ষীছড়ি সেনা জোন থেকে বিপুল সংখ্যক সেনা সদস্য বর্মাছড়ির শুকনাছড়ি ক্যাম্পে এসে জড়ো হয়। সেনাদের সাথে উৎপল চাকমা ও মিন্টু চাকমাসহ তিন জন ঠ্যাঙাড়ে দুর্বৃত্ত (মুখোশ) ছিল।

এরপর রাত ২:০০টার দিকে তিন জন ঠ্যাঙাড়ে দুর্বৃত্তসহ দুই শতাধিক সেনা সদস্য শুকনাছড়ি ক্যাম্প থেকে অভিযানের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় এবং বর্মাছড়ি ইউনিয়নের দেওয়ান পাড়া ও বৈদ্য পাড়া গ্রামে হানা অভিযান পরিচালনা করে।

তারা প্রথমে দেওয়ান পাড়ায় কালাচাঁন কার্বারীর ছেলে বসন্ত চাকমার বাড়ি ঘেরাও করে এবং তাকে বাড়ি থেকে বের করে রশি দিয়ে বেঁধে মাটিতে ফেলে লাঠি দিয়ে অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন করে। এ সময় তার কাছ থেকে ইউপিডিএফ সদস্যদের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে।

এরপর তাকে আটক করে নিয়ে সেনা ও ঠ্যাঙাড়েরা বৈদ্য পাড়ার হাজাছড়ি গ্রামে গিয়ে বৃষ কুমার চাকমার বাড়ি ঘেরাও করে। এ সময় তাকেও বাড়ি থেকে বের করে ইউপিডিএফের লোকজনের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে তাদের ঘরবাড়ি কোথায় জিজ্ঞাসা করে। তার বাড়ির আশে-পাশের স্থানে ঝোপঝাড়ে সেনারা তল্লাশি চালায়। তবে তারা অবৈধ কোন কিছুই পায়নি। এক পর্যায়ে বৃষ কুমার চাকমাকেও তারা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে।

জানা গেছে, সেনাদের সাথে থাকা ঠ্যাঙাড়ে দুর্বৃত্তদের মধ্যে উৎপল চাকমা (৩৪)-এর বাড়ি ফিত্তি পাড়ায়। তার পিতার নাম শশী ভূষণ চাকমা। আর মিন্টু চাকমার(২৬) বাড়ি উল্টাছড়ির বিহার পাড়ায়। তার পিতার নাম মৃত মনুচান চাকমা। আরেকজনের নাম-পরিচয় পাওয়া যায়নি।

ভুক্তভোগী বসন্ত চাকমা ঘটনার বর্ণনা দিয়ে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‍‍‍“ভোর ৪টা থেকে সাড়ে ৪টার সময় সেনাবাহিনী ও তাদের সাথে থাকা মুখোশরা আমার বাড়ি ঘেরাও করে। এরপর আমি ঘুম থেকে উঠি। তখন তারা আমার কাছ থেকে “কে পালিয়েছে” এমন কথা জিজ্ঞাসা করে। আমি দেখি নাই বলে উত্তর দিই। এরপর আমাকে বাড়ি থেকে উঠানে নামিয়ে বেঁধে মাটিতে ফেলে লাঠি দিয়ে মারধর করে। পরে তারা আমাকে মুক্তাছড়িতে নিয়ে যায়। সেখানে দীর্ঘক্ষণ ধরে আটক করে রাখে। মুখোশ উৎপল চাকমা ‘সুশীল’ নামে একজনের বাড়ি কোথায় জানতে চায়। এ অবস্থায় এক পর্যায়ে এলাকার নারীরা ও আমার অভিভাবকরা সেখানে গিয়ে পৌঁছে। এরপর নারীরা প্রতিবাদ জানালে পরে সেনাবাহিনী আমাকে ছেড়ে দেয়।”

তিনি বলেন, “নারীরা সেখানে গিয়ে প্রতিবাদ না গেলে সেনারা নিশ্চিত আমাকে ক্যাম্পে নিয়ে যেতো।”

সেনাদের সাথে থাকা ঠ্যাঙাড়ে (মুখোশ) উৎপল চাকমা তার কাছ থেকে ইউপিডিএফ সদস্যদের বিষয়ে নানা জিজ্ঞাসা করেছে বলে তিনি জানান।

আরেক ভুক্তভোগী বৃষ কুমার চাকমা ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, “সকাল প্রায় ৭টা বাজে। সেনাবাহিনী ও তাদের সাথে একই পোশাক পরা উৎপলসহ তিনজন চাকমা (একজনের কাছে বন্দুক ছিল) আমার বাড়ি ঘেরাও করে। তখন উৎপল (চাকমা) আমাকে বাড়ি থেকে নামতে বলেন। আমি বাড়ির ভেতর থেকে উঠানে নামলে উৎপল চাকমা আমার কাছ থেকে ‘ইউপিডিএফের লোকজন কোথায়’ তা জানতে চান। তখন আমি তাকে বলি, আমিতো জানি না। আমার এখানে ইউপিডিএফের কোনো লোকজন থাকেন না। সেনাবাহিনীর সদস্যরাতো বাড়ির আশে-পাশে সব তল্লাশি চালিয়েছে। কই কিছুইতো পায়নি। শুধু শুধু আমাকে কেন জড়াতে চাচ্ছেন।

“এরপর উৎপল আমার কাছ থেকে ‘উদ্ধৃতি’ নামে একজনের বাড়ি কোথায় তা জানতে চায়। আমি চিনি না বলে তাকে জানাই। তারপর একজন সেনা সদস্য একটি লাঠি দিয়ে আমাকে পাশায় আঘাত করে ও গালে একটি চড় দেয়।”

“এরপর তারা আমার কাছ থেকে ‘সুশীল’ নামে একজনের বাড়ি খোঁজ করে। তখন আমি বলি ‘সুশীল’তো আমার পাড়ার বাসিন্দা নয়। আমি তাকে চিনি না। পরে তারা মুক্তাছড়ি যাওয়ার রাস্তা জানতে চায় এবং আমাকেও তাদের সাথে যেতে হবে বলে জানায়।

“তারা বলে, তোমাকে অবশ্যই সুশীলের বাড়ি দেখিয়ে দিতে হবে। তখন আমি বলি, আমাকে মেরে ফেললেও সুশীলের বাড়ি আমি দেখিয়ে দিতে পারবো না। কারণ আমি তাকে চিনি না। তারা আবার ‘উদ্ধৃতি’ নামে একজনের বাড়ি দেখিয়ে দিতে বলে। আমি তাও না করে দিই।” 

তিনি আরও বলেন, “বাড়িতে আমার নাতি অসুস্থ ছিল। বাড়ির সবাই কাজে যাওয়ায় আমি আর অসুস্থ নাতি দুজনে বাড়িতে ছিলাম। আমি নাতিকে গরম পানি খাওয়ানোর জন্য আগুন জ্বালোনোর অনুমতি চাইলে একজন মেজর তাতে বাধা দিয়ে বলেন, ‘নাতি মারা গেলেও আগুন জ্বালানো ও তাকে ঔষধ-পানি খাওয়ানো যাবে না। তোমাকে আমার সাথে যেতে হবে।

“এ অবস্থায় সেনারা আমাকে তাদের সাথে নিয়ে যায়। বাধ্য হয়ে অসুস্থ নাতিকে বাড়িতে একা রেখে যেতে হয়” বলেন তিনি।”

নেওয়ার সময় ঠ্যাঙাড়ে উৎপল তাকে লাঠি দিয়ে আঘাত করে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

তিনি বলেন, “এরপর আমাকে মুক্তাছড়ির বলিপাড়ায় নিয়ে একটি দোকানে আটকে রাখে। চারদিকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা পাহারায় ছিল। সেখানে উৎপল (ঠ্যাঙাড়ে) ইউপিডিএফ সদস্যদের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। আমি আগের মতোই জানিনা বলে উত্তর দিই। এমতাবস্থায় এলাকার নারীরা সেখানে গিয়ে উপস্থিত হয়। তারা সেনাবাহিনীর সাথে তর্কাতর্কি করে আমাদেরকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসেন। না হলে সেনারা আমাকে ক্যাম্পে নিয়ে যেতো।”

দুই ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে আনতে প্রতিবাদ করতে যাওয়া এক নারী বলেন, “আমরা নারীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুক্তাছড়িতে যাই। আমরা যাওয়া মাত্র সেনা সদস্যরা সবাই বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। তখন তারা বসন্ত চাকমাকে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। তখন আমি সেনা কমান্ডারের সাথে কথা বলতে যেতে চাইলে তারা প্রথমে বাধা দেয়। পরে আমি জোর করে গিয়ে কথাবার্তা বলি। আমার সাথে আরও নারী ছিল। তারা বিকাল ৪টায় ক্যাম্প থেকে ছেড়ে দেওয়ার কথা জানালে আমরা তাতে প্রতিবাদ করি। পরে তারা দুপুর ১:০০টায় ছেড়ে দেবে বলে জানায়। আমি তাদেরকে বলি, ‘আমরা ক্যাম্পে যেতে পারবো না, এখান থেকেই ছেড়ে দিতে হবে। আমরা আমাদের ভাইদের নিতেই এখানে এসেছি।’ এরপর সেনারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করার পর আটক দুজনকে ছেড়ে দেয়।”

সেনারা এ ঘটনার বিষয়ে ‘কোন ভিডিও প্রচার করা যাবে না’- এমন শর্ত দেয় বলে ওই নারী জানান।

অভিযান শেষে সকাল সাড়ে ১০টার সময় সেনারা মুক্তাছড়ির বলিপাড়া থেকে গরমছড়ি হয়ে শুকনাছড়ি ক্যাম্পে চলে যায় বলে জানা গেছে।

গুইমারা ব্রিগেড কমান্ডার ও লক্ষীছড়ি জোন কমাণ্ডারের তত্ত্বাবধানে লক্ষীছড়ি জোনের টু-আইসির নেতৃত্বে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। শুকনাছড়ি ক্যাম্পে অবস্থান করে গুইমারা ব্রিগেড কমান্ডার ও লক্ষীছড়ি জোন কমান্ডার পুরো অভিযান তত্ত্বাবধান করেছেন বলে একটি বিশেষ সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে, ঠ্যাঙাাড়ে দুর্বৃত্তদের সাথে নিয়ে সাধারণ জনগণের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর এমন নিপীড়ন ও হয়রানিমূলক অভিযানকে ন্যাক্কারজনক উল্লেখ করে এলাকাবাসী এর তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা সেনাবাহিনীর এমন অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়ানোর জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।



This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More