বাধার মধ্যেও সাজেক কলেজে শিক্ষার্থীদের ক্লাস নিলেন শিক্ষকরা

0

সাজেক প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬

বনবিভাগসহ সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনের নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে রাঙামাটির সাজেকে এলাকাবাসীর নির্মিত সাজেক কলেজে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের এতদিন কলেজ ভবনের বাইরে পাঠদান করে আসছিলেন শিক্ষকরা। কিন্তু এতে নানা সমস্যা হওয়ার কারণে আজ সোমবার (১০ আগস্ট ২০২৬) সকাল ১০টা হতে শিক্ষকরা কলেজের রুমে ক্লাস নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

বিষয়টি জানতে পেরে বনবিভাগের কর্তৃপক্ষ ও সেনাবাহিনী তাতে বাধা প্রদান করে।

আজ সকাল ৯টা সময় বাঘাইহাট সেনাজোনের টুআইসি মো. সালমান-এর নেতৃত্বে জোন এফএস মো. হুমায়ুন, মো. সিরাজ ও মো. জসিমসহ দুটি পিকআপে করে একদল সেনা সদস্য এবং বনবিভাগের বাঘাইহাট রেঞ্জের সহকারী কর্মকর্তা মো. রিফাত হোসেনসহ ৪-৫ জন উজোবাজারে গিয়ে অবস্থান নেয়। এ সময় সাজেক কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সদস্য বাবু ধন চাকমাকে বাঘাইহাট জোনের টু আইসি মো. সালমান বলেন, জোনের সাথে সমন্বয় না করে এবং জোন কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত না হলে কলেজের ক্লাসরুমে পাঠদান করা যাবে না।

তখন বাবুধন চাকমা তাঁকে বলেন, আপনারা যে দাবি করছেন তা সাজেকে সাধারণ জনগণ মানতে পারছে না। সাধারণ জনগণ চায় জনগণের প্রচেষ্টায় নির্মিত কলেজ জনপ্রতিনিধিদের কর্তৃক পরিচালিত হবে।

তাঁর একথা শুনে মো. সালমান ‘জোনে গিয়ে বিষয়টি সিও স্যারকে বলেন’ এমন কথা বলে সেখান থেকে জোনে ফিরে যান।

এরপরও শিক্ষকরা কলেজ রুমে গিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্লাস নিতে থাকেন।

পরে দুপুর ১২টার দিকে কলেজে ক্লাস চলাকালীন বাঘাইছড়ি উপজেলা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কর্মকর্তা সমাবেশ চাকমা, মাচলঙ থানার ওসি মো. তোফাজ্জল, বাঘাইহাট জোনের এফএস মো. জসিম, মো. ইশহাক, রাঙামাটি বনবিভাগের এসিএফ মো. আবু সালাহ-সহ সাজেকের জনপ্রতিনিধিরা কলেজে যান।

এ সময় মাচলঙ থানার ওসি তোফাজ্জল বলেন, কলেজ নির্মাণের সময় বনবিভাগ হতে মামলা দেওয়া হয়েছিল, যা এখনো চলমান। মামলা নিষ্পত্তি না করে এখানে কেন ক্লাস নিচ্ছেন? কে অনুমতি দিয়েছে?

তার কথার সাথে সুর মিলিয়ে বনবিভাগের কর্মকর্তা মো. আবু সালাহ বলেন, একটা জিনিসের যদি বৈধতা না থাকে তাহলে এখানে তো একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চলতে পারে না। আপনারা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে বৈধতা নিয়ে তারপর ক্লাস নিতে পারতেন।

কলেজের অধ্যক্ষ সুমন চাকমা বলেন, “আমরা কলেজে ২৬ মার্চ উদযাপন করেছি, তখন বাঘাইহাট জোনের উপাধিনায়ক কলেজ চালুর জন্য দুইমাস সময় চেয়েছিলেন এবং এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদেরও ভর্তি করা যাবে এমন আশ্বাস দিয়েছিলেন। আমরা সেই সময়ের অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু কলেজে ক্লাস শুরুতো দূরের কথা, বরং সপ্তাহখানেক আগে কলেজ কমিটিকে আরো জোনে ডাকা হয় এবং সেখানে কলেজ কমিটি হতে ফান্ডিং-এর নিশ্চয়তা চাওয়া। সেই নিশ্চয়তা দেওয়ার পরই কলেজে ক্লাস করা যাবে-এমন আশ্বাস দেওয়া হয়। তাও কলেজ কমিটির পক্ষ থেকে তড়িঘড়ি করে গতকাল ৪নং ওয়ার্ড মেম্বার সেই নিশ্চয়তা পত্র জমা দিয়েছেন।

“অপরদিকে, শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে ক্লাস করার অনুপযোগী ছোট্ট দোকান ঘরে ক্লাস করে আসছে এবং অনেক শিক্ষার্থী প্রশাসনের ভয়ে ক্লাসে আসে না। ফলে পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অভিভাবকবৃন্দ খুবই মানসিক ও হতাশার মধ্যে দিনযাপন করেছেন। তাই আজকে যেসব শিক্ষার্থীরা কলেজে ক্লাস করতে এসেছে তাদেরকে আমরা ক্লাস আমরা নিচ্ছি।”

তিনি আরও বলেন, বার্মা থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের জন্য কোটি কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়, অথচ এ কলেজটা আমাদের এলাকার জনগণের অর্থায়নে বাস্তবায়ন হচ্ছে। তাহলে এখানে বাধা কেন?

কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সদস্য বাবুধন চাকমা বলেন, শিক্ষা হচ্ছে মানুষের মৌলিক অধিকার। এই অধিকারটুকু আমাদের চাইতে হয় না। সরকার আমাদেরকে দিতে বাধ্য। 

তিনি বলেন, কয়েক মাস আগে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট এ কলেজ নির্মাণকে কেন্দ্র করে ৫০ লক্ষ টাকার ক্ষয়-ক্ষতির মামলা দিয়েছে। আপনারা দেখেন, এখানে ৫০ লক্ষ টাকার সম্পত্তি কি আছে। আমারা এখানে একটা কলেজ করতে চাচ্ছি। এখানে কোন রাষ্ট্রের ক্ষতিকরমূলক কোন কাজের জন্য এই কলেজটি নির্মাণ করা হচ্ছে না। সাজেকে বঞ্চিত শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষালাভের সুবিধার্থে আমরা এখানে কলেজটি নির্মাণ করেছি। এ বিষয়ে আমরা জেলা-উপজেলাসহ সবখানে অবগত করেছি। কিন্তু কী কারণে আমাদেরকে অনুমতি দেওয়া হলো না, বিপরীতে আমাদের ওপর মামলা চাপিয়ে দেওয়া হলো- এটা প্রশ্ন থেকে যায়।

বাবুধন চাকমা প্রশ্ন রেখে আরও বলেন, আমরা কেন এখানে কলেজ করতে পারবো না। আমাদেরকে বারবার ফরেস্ট আইনের অজুহাত দেওয়া হয়। এখানে হাজার হাজার মানুষের বসবাস। তাহলে কোনটা ফরেস্টের আর কোনটা আমাদের- এ প্রশ্নের উত্তর ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টকে দিতে হবে।  

তিনি বলেন, পাহাড়ি হয়ে জন্মগ্রহণ করা কি আমাদের ভুল হয়েছে? এখান থেকে ২০ গজ দূরে বাজার, চারপাশে বসতবাড়ি, তো এই কলেজের জায়গাটা কিভাবে ফরেস্টের হয়ে থাকে। আপনারা শুধু শুধু ৫০ লক্ষ টাকার ক্ষয়-ক্ষতির মামলা দিয়ে আমাদেরকে হয়রানি করছেন।  

সেখানে উপস্থিত জিকু চাকমা নামে আরেকজন বলেন, কাপ্তাই বাঁধের কারণে উচ্ছেদ হয়ে আমরা এখানে বসতি করতে বাধ্য হয়েছি। সরকার আমাদেরকে এখানে বসবাস করতে দিয়েছে। আমরা যদি এখানে বসবাস করে কলেজ বা কোন কিছু নির্মাণ করতে না পারি, বাড়ি করতে না পারি তাহলে আমাাদেরকে বাঁধটা খুলে দেন আমরা আগের জায়গায় চলে যাই।

তার এ কথার কোন সুদুত্তর  উপস্থিত কর্মকর্তারা দিতে পারেননি। পরে আর কোন কথা না বলে তারা সেখান থেকে চলে যান।

এর আগে গত ৬ আগস্ট সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের কার্যালয়ে এক আলোচনা সভায় কলেজ পরিচালনার পর্ষদের কাছে বাঘাইহাট জোনের এফএস মো. হুমায়ুন তিনটি দাবি উত্থাপন করেন। দাবিগুলো হলো- ১.  জোনের টুআইসিকে সাজেক কলেজ পরিচালনার পর্ষদের সভাপতি করতে হবে; ২. সাজেক কলেজে নিয়োগ করা শিক্ষকদের বাতিল করে নতুন করে শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে ও ৩. কলেজ নির্মাণে সকল খরচ, নির্মাণের আর্থিক উৎস ও হিসাব জোনে প্রতিবেদন দিতে হবে।

এ দাবি না মানা পর্যন্ত সাজেক কলেজে ক্লাস নেওয়া যাবে না বলে তিনি জানিয়ে দেন।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে কলেজ নির্মাণের শুরু হতে সেনাবাহিনী ও বনবিভাগ কর্তৃক নানাভাবে বাধা প্রদান করে আসছে। এরই অংশ হিসেবে সাজেক কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোক্তা সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অতুলাল চাকমা, ইউপি সস্য পরিচয় চাকমার নাম উল্লেখ মামলা দেওয়া হয় এবং কলেজ নির্মাণের নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বনবিভাগকে দিয়ে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেওয়া হয়।

শুধু তাই নয়, রাতের আঁধারে কলেজ রুমে সেনাবাহিনীর তল্লাশি, কলেজের নাইটগার্ডদের হয়রানিসহ আরো নানা ঘটনা সংঘটিত করা হয়েছে, যাতে কলেজের কার্যক্রম শুরু করা না যায়।

কিন্তু সকল প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করে সাজেক কলেজে শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষার্থী ভর্তি এবং শিক্ষার্থীদের পাঠদানের উদ্যোগ গ্রহণ করে কলেজ পরিচালনা পর্ষদ। এতদিন কলেজের বাইরে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করলেও আজই প্রথমবারের মতো কলেজ রুমে পাঠদান করেন শিক্ষকরা।



This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More