বান্দরবানে বিনামূল্যে শিক্ষা নিতে গিয়ে ধর্মান্তরকরণের শিকার হচ্ছে ম্রো শিশুরা
নেত্র নিউজের প্রতিবেদন

বান্দরবান, সিএইচটি নিউজ
বুধবার, ৬ মে ২০২৬
পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবানে বিনামূল্যে শিক্ষা নিতে গিয়ে ধর্মান্তরকরণের শিকার হচ্ছে দারিদ্র্যে জর্জরিত প্রান্তিক ম্রো জনগোষ্ঠীর শিশুরা। অভিভাবকদের অজ্ঞাতে বদলে ফেলা হচ্ছে তাদের নাম। সম্প্রতি এমন তথ্য ভিত্তিক একটি ভিডিও প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সুইডেন ভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম নেত্র নিউজ। প্রতিবেদনটি গত ৩ মে ২০২৬ নেত্র নিউজের ফেসবুক পেইজ ও ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ ধরনের ধর্মান্তরকরণের কাজে জড়িত বিভিন্ন মাদ্রাসা ও ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্র ভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের পার্বত্য জেলা বান্দরবানের দ্বিতীয় বৃহত্তম আদিবাসী জনগোষ্ঠী ম্রো। স্বতন্ত্র ভাষা ও সংস্কৃতি সমৃদ্ধ এ সম্প্রদায়ের মানুষেরা আলীকদম, লামা, থানচি, রুমা, নাইক্ষ্যংছড়ি, রোয়াংছড়ির দুর্গম পাহাড়ি পল্লীগুলোতে বসবাস করে। সরকারি জরিপে ম্রো জনগোষ্ঠীর সংখ্যা সাড়ে ৫৬ হাজার, তবে স্থানীয় পাড়া কারবারিদের তথ্য অনুযায়ী অন্তত ৮০ হাজার ম্রো রয়েছেন।
এতে বলা হয়েছে, দারিদ্র্যে জর্জরিত প্রান্তিক ম্রো পাড়ার শিশুরা শিক্ষার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। এই সুযোগ নিয়ে অনেকেই তাদেরকে বিনামূল্যে শিক্ষা দেওয়ার নাম করে ধর্মান্তরিতকরণের মতো অভিশপ্ত পথে নিয়ে যাচ্ছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বান্দরবানের আলী কদম, থানচি ও চিম্বুকে ধর্মান্তরিত করা ২২ জন ম্রো শিশুর সন্ধান পাওয়া গেছে। ইকরা তাহসীনুল কুরআন মাদ্রাসা, আস আদ একাডেমি, চৈক্ষ্যং এবং ১১ কিলো মডেল একাডেমি- এসব প্রতিষ্ঠানে শিশুদের নাম ও ধর্ম পরিবর্তন করে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ম্রো অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দারা। ধর্ম এবং নাম পরিবর্তন করা শিশুদের মধ্যে একজন লাংরাও ম্রো।
প্রতিবেদনে লাংরাও ম্রো বিষয়ে বলা হয়, বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর হতদরিদ্র চাচার পক্ষে লাংরাওর শিক্ষার খরচ জোটানো সম্ভব ছিল না। তাই বিনামূল্যে শিক্ষার আশ্বাস পাওয়ায় ২০২৩ সালে লাংরাওকে পাঠানো হয় ইক্বরা তাহসীনুল কোরআন মাদ্রাসায়। মাদ্রাসায় থাকাকালীন তার নাম পরিবর্তন করে দেওয়া হয়। এতে তার অথবা পরিবারের কোন সম্মতি নেওয়া হয়নি। তাদেরকে আরবীতে পড়াশোনা করানো হয়। যখন পড়া পারে না, তখন তাদের উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়- এমন অভিযোগ তুলে ধরা হয় প্রতিবেদনে।
নেত্র নিউজের প্রতিবেদকের কাছে শিশু লাংরাও ম্রো বলেন, “আমার আসল নাম লাংরাও ম্রো। মাদ্রাসায় থাকাকালীন আমার নাম পরিবর্তন করে দেয়। আমার নাম পরিবর্তনের ইচ্ছে ছিল না। আমরা আরবিতে লেখাপড়া করি। আমরা যখন পড়া পারি না, তখন আমাদের মারে, বকা দেয়, নির্যাতন করে। আরবী আমরা পড়তে পারি না। ম্রো বর্ণমালা না হওয়ায় আমরা আরবী পড়তে পারি না।“
লাংরাও ম্রো’র পিতা মাংয়িয়া ম্রো বলেন, ‘ঈদগাও বাজার মাদ্রাসায় আমার ছেলে পড়াশোনা করতে যাওয়ার সময় নাম পরিবর্তন করে দেয়। লাংরাও থেকে আমিরুদ্দিন রাখে। এজন্য ওখানে না রেখে নিয়ে এসেছি।”
খরচ্যং পাড়ার বাসিন্দা কাংপং ম্রো বলেন, ‘বাচ্চারা যারা পড়াশোনা করছে তাদের নাম পরিবর্তন করতে আমরা বলিনি। তাদের ইচ্ছে অনুযায়ী তারা নিজেদের ইচ্ছামতো নাম রেখে দিয়েছে। আমরা লেখাপড়া করার জন্য পাঠিয়েছি সত্য, কারণ আমরা গরীব।”
আরেকজন অভিভাবক বলেন, “আমার ছোট ছেলেটার নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে সাইফুল। তার আগের নাম ছিল ক্রং লিউ।”
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘শিশুদের ধর্মান্তরকরণের চলমান প্রক্রিয়াকে অস্তিত্বের জন্য হুমকি বলে মনে করছে ম্রো সম্প্রদায়’।
এ বিষয়ে বান্দরবান জেলা পরিষদের সদস্য কামলাই ম্রো’র বক্তব্য তুলে ধরা হয় প্রতিবেদনে। তিনি বলেন, “ম্রো জনগোষ্ঠির দারিদ্যের সুযোগ নিয়ে তাদের বাচ্চাদের ধর্মান্তরিত করার বা বিভিন্ন মাদ্রাসা বা ইসলামিক শিক্ষা কেন্দ্রে নিয়ে লেখাপড়া করানোর এটা আমাদের জন্য একটা ‘এলার্মিং’ বিষয়। মাদ্রাসায় নিয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে তাদের (শিশুদের) পাঞ্জাবি-টুপি পরানো হচ্ছে, নামও পরিবর্তন করে দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়টা গত ৩-৪ বছর ধরে চলছে। নাইক্ষ্যংছড়ি, আলীকদম, কুরুকপাতা, পোয়ামুহুরি-সহ যেসব দুর্গম এলাকা রয়েছে, সেসব এলাকার বাচ্চাগুলিকে বেশি নিয়ে আসা হচ্ছে। এটা যদি বন্ধ করা না যায় ভবিষ্যতে আমাদের জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বে সংকটের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।”
প্রতিবেদনে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন-এর বক্তব্যও তুলে ধরা হয়েছে। তিনি এ বিষয়ে বলেন, “কোন শিশুকে যদি ধর্মান্তরিত করতে হয় তাহলে সেটা তার পিতা-মাতা বা অভিভাবকদের জানাতে হবে। ওই এলাকায় যদি উন্নত স্কুল না থাকে, শিশুর অভিভাবকরা তাদের কিভাবে পাঠাতে চাচ্ছে শিক্ষা অর্জনের জন্য সেটা অন্য বিষয়। শিক্ষা অর্জনের জন্য হয়তো অভিভাবকরা সম্মতি দিয়েছে, কিন্তু ধর্মান্তরিত করার জন্য নিশ্চয় সম্মতি দেয়নি। আইন অনুযায়ী এগুলো ফোজদারী অপরাধের মধ্যে পড়ে।’
মানবাধিকার কর্মী ও গবেষক সাইদিয়া গুলরুখ বলেন, “এটা অবশ্যই এথনিক ক্লিনজিংয়ের একটা অংশ। কোন জাতিগোষ্ঠীকে নিধন করার ক্ষেত্রে সবসময় যে গুলির ব্যবহার করা হয় তা নয়, সাংস্কৃতিক অধিকার খর্ব করে, জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়েও জাতিগত নিধন বা এথনিক ক্লিনজিং হতে পারে।”
প্রতিবেদনে ম্রো শিশুদের সংস্কৃতি ও জীবনধারা রক্ষা করে তাদেরকে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার আওতায় আনা এবং শিশুদের ধর্মান্তকরণ বন্ধ করতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আহ্বান সম্বলিত বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে।
এতে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আদিবাসী বিষয়ক উপদেষ্টা ক্রিস চ্যাপমান বলেন, “আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় বিশেষত শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী, বাংলাদেশ ম্রো জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষিত করতে বাধ্য। এর মধ্যে প্রতিটি ম্রো শিশুর অধিকার অন্তর্ভুক্ত। ম্রো শিশুদের তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি উপভোগ ও চর্চা করার অধিকার রয়েছে। তাদের আছে চিন্তা ও ধর্মের স্বাধীনতা এবং তাদের নিজস্ব ভাষা ব্যবহার, আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য এবং পরিচয় বজায় রাখার অধিকার। বাংলাদেশকে অবশ্যই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে যাতে কোন সরকারি বা বেসরকারি পক্ষ তাদের এই অধিকারগুলোতে হস্তক্ষেপ করতে না পারে। তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান রেখে শিক্ষা, সুরক্ষা ও সার্বিক বিকাশের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।”
ইক্বরা তাহসীনুল কুরআন মাদ্রাসার শিক্ষক নজরুল ইসলাম ম্রো শিশুদের নাম পরিবর্তনের বিষয়টি স্বীকার করে নেত্র নিউজের প্রতিবেদককে বলেন, “প্রতিষ্ঠানের সুবিধার্থে ও কঠিন কঠিন নাম ডাকতে অসুবিধা হওয়ায় এবং বাঙালি শিশুদের সাথে মিলেমিশে থাকার জন্য তাদের নামগুলো পরিবর্তন করে দেওয়া হয়।”
প্রতিবেদনের শেষে বলা হয়, ‘ম্রো পাড়াগুলোতে স্কুলের অপেক্ষায় রয়েছে শিশুরা এবং নিজস্ব সংস্কৃতি ও জীবনধারা সংরক্ষণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের প্রতীক্ষায় রয়েছে ম্রো জনগোষ্ঠী।
সূত্র: নেত্র নিউজ
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
