সাজেকে চলমান সংকটের উপর ইউপিডিএফের মানবাধিকার পরিবীক্ষণ সেলের প্রতিবেদন প্রকাশ

নিজস্ব প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
রাঙামাটির সাজেকে চলমান সংকটের উপর একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)-এর মানবাধিকার পরিবীক্ষণ সেল।
“প্রশ্নবিদ্ধ সেনাবাহিনীর সন্ত্রাস দমনের অঙ্গীকার: রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলাধীন সাজেক ইউনিয়নে চলমান সংকটের উপর প্রতিবেদন ও কতিপয় সুপারিশ” শিরোনামে আজ মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর ২০২৬) ইউপিডিএফের ওয়েবসাইট (www.updfcht.com) ও অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভূমিকায় বলা হয়েছে, “রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নে ২০২৬ সালের আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সংঘটিত ঘটনাবলি এক গভীর মানবিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংকটের সৃষ্টি করেছে। বাহ্যিকভাবে সাজেক একটি মনোরম প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হলেও, এর আড়ালে রয়েছে স্থানীয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ধারাবাহিক প্রান্তিকীকরণ, ব্যাপক সামরিক নিয়ন্ত্রণ এবং মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের দীর্ঘ ইতিহাস। ২০০৮ এবং ২০১০ সালে সাজেকে পাহাড়িদের ওপর সেনা-সেটলারদের সাম্প্রদায়িক হামলা চালিয়েছিল। এতে শতশত ঘরবাড়ি আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়, এবং সেনাবাহিনীর গুলিতে একাধিক পাহাড়ি নিহত হন।
প্রতিবেদনে গত আগস্ট মাসে সাজেকে জেএসএস সন্তু গ্রুপ কর্তৃক ফেরদৌস চাকমা নামে এক ব্যক্তিকে অপহরণের সাথে সেনাবাহিনীর সম্পর্ক, সাজেক কলেজ নির্মাণের সেনাবাহিনীর বাধা সৃষ্টি, গত ৩১ আগস্ট সেনাবাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতায় সাজেকের মাচলং এলাকায় জেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের নিয়ে আসা, জেএসএসের সশস্ত্র সদস্যদের এলোপাতাড়ি গুলিতে ৮ বছরের শিশু কস্মিতা ত্রিপুরা গুলিবিদ্ধ হওয়া, জুমচাষীদের ওপর সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের গুলিবর্ষণ ও বিভিন্ন গ্রাম থেকে লোকজনের মোবাইল ফোন জব্দ করা, একই সাথে এলাকার সাধারণ জনগণের ঘরবাড়িতে সেনাবাহনীর তল্লাশি, নির্যাতন ও এক ব্যক্তির বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাবলীর বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।
সাজেকবাসীর আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘জেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের অপতৎপরতাএবং সেনাসদস্যদের হয়রানির প্রতিবাদে সাজেক কার্বারী অ্যাসোসিয়েশন ও সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির নেতৃত্বে এলাকাবাসী তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন। তারা ১ ও ৮ অক্টোবর বিক্ষোভ প্রদর্শন করে সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদর সরিয়ে নেয়ার দাবিতে ৪৮ ঘন্টার আল্টিমেটাম দেন। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে প্রশাসন দাবি বাস্তবায়নের পদক্ষেপ না নিলে ১১ অক্টোবর থেকে তারা অনির্দিষ্টকালের জন্য সড়ক অবরোধের ঘোষণা দেন এবং যথারীতি অবরোধ পালনকালে সেদিন বিকালে সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তারা উজোবাজারে গিয়ে অবরোধকারীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের উত্থাপিত তিন দফা শর্ত দুই দিনের মধ্যে বাস্তবায়নের আশ্বাস প্রদান করা হয়। এরপরও দাবি বাস্তবায়নে কোন অগ্রগতি না হওয়ায় ১৫ অক্টোবর একটি অবরোধ কর্মসূচি পালনের পর দুর্গাপূজার কারণে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর অবরোধ স্থগিত করা হয়। কিন্তু এই এক সপ্তাহ সময়ের মধ্যেও প্রশাসন মেনে নেওয়া শর্ত বা দাবি না মানেলে দুই সংগঠন ২২ অক্টোবর থেকে অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধের ঘোষণা দেয়। ঘোষণা মোতাবেক সেদিন শান্তিপূর্ণ অবরোধ পালনকালে সাজেকের উজোবাজারে সেনাবাহিনী অবরোধকারী জনতার ওপর হামলা চালায়। এতে অন্তত ৭৮ জন নারী-পুরুষ-শিশু আহত হন। উজোবাজারে ব্যাপক ভাঙচুর ও লূটপাট চালানো হয়।
আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরকারি প্রতিনিধি দলের বৈঠক বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘গত ২৬ অক্টোবর ২০২৬ আন্দোলনকারী দুই সংগঠন সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দের সাথে সরকারি প্রতিনিধি দলের মধ্যে সাজেকের উজোবাজারে আড়াই ঘন্টা ব্যাপী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু বৈঠকে সরকারের প্রতিনিধি দলটি সাজেক থেকে সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সরকার পক্ষের অনমনীয়তার কারণে বৈঠকে কোনো সমঝোতা হয়নি। ফলস্বরূপ, দুই সংগঠন অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছেন।’
প্রতিবেদনে ‘সেনাবাহিনীর সন্ত্রাস দমনের অঙ্গীকার প্রশ্নবিদ্ধ’ উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ‘সাজেকের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র বিশ্লেষণ করলে সন্ত্রাস দমনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অঙ্গীকার ও ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দেয়। সেনাবাহিনী যেভাবে একটি সশস্ত্র গ্রুপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে বা প্রশ্রয় দিচ্ছে, তা গভীর উদ্বেগের বিষয়।’
এতে জেএসএস(সন্তু)-এর সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে আশ্রয় ও রসদ সরবরাহ: অপরাধী ও অপহৃত ব্যক্তিকে রক্ষায় সন্তু গ্রুপের সাথে গোপন সমঝোতা: সেনাক্যাম্পের কাছে সন্তু গ্রুপের অপরাধ সংঘটনের পরও নীরবতা পালন; সাধারণ জনগণের আন্দোলন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর দমনপীড়ন; সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো সাধারণ মানুষের ঘরে অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে ৫ দফা সুপারিশ করা হয়েছে। সেগুলো হলো:
১) সন্ত্রাসের বিপক্ষে সরকারের দৃশ্যমান দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করা এবং সাজেকবাসীর দাবি মেনে নিয়ে জনসংহতি সমিতির সন্তু লারমা গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদেরকে সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়া।
২) চলমান সাজেক সংকট নিরসনের জন্য সাজেকবাসীর প্রতিনিধির সাথে আলোচনা অব্যাহত রাখা।
৩) প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনকালে সন্তু লারমা কর্তৃক সশস্ত্র দল পরিচালনা করা সম্পূর্ণ বেআইনি কাজ এবং এটি দণ্ডনীয় অপরাধও। তাই, এ বিষয়ে সন্তু লারমার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং সাজেক থেকে তার সশস্ত্র সদস্যদেরকে সরিয়ে নিতে চাপ প্রয়োগ করা অথবা তার সশস্ত্র সদস্যদের নিষ্ক্রিয় করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
৪) শান্তিপূর্ণ সড়ক অবরোধ চলাকালে ২২ অক্টোবর আন্দোলনকারীদের ওপর বিনা উস্কানিতে হামলার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ ও শাস্তি প্রদান, আহতদের সুচিকিৎসা ও ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৫) সাজেকসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করা।
* পুরো প্রতিবেদনটি পড়তে ক্লিক করুন এখানে।
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
