সেপ্টেম্বর মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র

0


সিএইচটি নিউজ ডেস্ক

সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬

গত সেপ্টেম্বর মাসে পাবত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে ইউপিডিএফের মানবাধিকার পরিবীক্ষণ সেলের মাসিক রিপোার্ট “পরিবীক্ষণ’-এ।

গতকাল (৪ অক্টোবর ২০২৬) এ রিপোর্টটি প্রকাশ করা হয়। এতে রাষ্ট্রীয় বাহিনী, জেএসএস সন্তু গ্রুপ, ঠ্যাঙাড়ে সন্ত্রাসী কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ ভূমি বেদখলের ঘটনাবলী তুলে ধরা হয়েছে।

রিপোর্টে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তুলে ধরে বলা হয়েছে, “পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘন যেন স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন এ অঞ্চলে মানবাধিকার লঙ্ঘন অব্যাহত থাকে। অতীতের সরকারগুলোর মতো বর্তমান ক্ষমতাসীন তারেক রহমানের বিএনপি সরকারের সময়েও এর ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। 

“গত সেপ্টেম্বর মাসে চার ব্যক্তিকে সেনাবাহিনী অন্যায়ভাবে আটক করে। এদের মধ্যে এক শিক্ষকসহ তিন জনকে হয়রানির পর ছেড়ে দেওয়া হলেও ছবি রঞ্জন ত্রিপুরা নামে একজনকে গ্রেফতার করে ‘ইউপিডিএফ কর্মী’ সাজিয়ে অস্ত্র গুঁজে দিয়ে মিথ্যা মামলায় জেলে প্রেরণ করা হয়েছে। তাকে মাটিরাঙ্গার ধামাই পাড়ার নিজ বাড়ি থেকে বিনা কারণে আটক করা হয়েছিল। তিনি সাধারণ একজন গ্রামবাসী।

“আলোচ্য মাসে সেনাবাহিনী ও বিজিবির হাতে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অন্তত ৪ জন। এদের মধ্যে রাঙামাটির সাজেকে দুই যুবক সেনাবাহিনীর নির্যাতনের শিকার হন। অপর নির্যাতনের ঘটনাটি ঘটে রাঙামাটির বিলাইছড়িতে। সেখানে দুমদুমিয়া বিজিবি ক্যাম্প কমান্ডারের নেতৃত্বে এক দল বিজিবি সদস্য কর্তৃক দুই পাহাড়িকে ‘ভারতীয় নাগরিক’ তকমা দিয়ে আটক করা হয়। তাদেরকে রশি দিয়ে বেঁধে রেখে অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বিলাইছড়িতে বিজিবির নির্যাতন গুরুতর আহত হয়ে মুমূর্ষূ অবস্থায় পড়ে রয়েছে এক ব্যক্তি। তার হাতে রশি বাঁধা দেখা যাচ্ছে। #ভিডিও থেকে নেওয়া ছবি 

“হয়রানিমূলক তল্লাশি চালানো হয়েছে ২০ ব্যক্তির বাড়িতে ও এক জনের দোকানে। এছাড়া আরো অন্তত ৯ গ্রামবাসীর বাড়ি ঘেরাও করে হয়রানি ও তল্লাশির চেষ্টা চালানো হয়েছে।

“সেপ্টেম্বর মাস জুড়ে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির বিভিন্ন স্থানে ইউপিডিএফের সাংগঠনিক এলাকায় সেনা টহল-তৎপরতা চালানো হয়। রামগড়ে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি বিজিবিও ব্যাপক তৎপরতা চালিয়েছে। মূলত ইউপিডিএফকে টার্গেট করেই রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলো প্রতিনিয়ত এ ধরনের তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।

“বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএসের সশস্ত্র গ্রুপকে মদত ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের অভিযোগও উঠেছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে কয়েকটি স্থানে জেএসএসের সশস্ত্র গ্রুপের সাথে সেনাবাহিনীর বৈঠক, তাদেরকে রসদ সামগ্রী সরবরাহ, জেএসএসের সশস্ত্র গ্রুপকে ইউপিডিএফের সাংগঠনিক এলাকায় নিয়ে যাওয়ার মতো ঘোরতর অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ১ সেপ্টেম্বর সাজেকে জেএসএসের সশস্ত্র সদস্যদের জন্য পানিসহ অন্যান্য রসদ সামগ্রী সরবরাহ করা, ৯ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ির পানছড়িতে জেএসএসের সশস্ত্র গ্রুপের সাথে সেনা কর্মকর্তাাদের গোপন বৈঠক, ১১ সেপ্টেম্বর পানছড়ির যুবনাশ্ব পাড়ায় জেএসএসের সশস্ত্র সদস্যদের প্রবেশের পথ সুগম করে দিতে ড্রোন উড়িয়ে নজরদারিসহ সহযোগিতা প্রদান এবং ৩০ সেপ্টেম্বর মাটিরাঙ্গায় যামিনী পাড়া বিজিবি ক্যাম্পে জেএসএসের সশস্ত্র সদ্যদের সাথে সেনাবাহিনী ও বিজিবি কর্মকর্তাদের বৈঠকের ঘটনাগুলো উল্লেখযোগ্য।”

জেএসএস সন্তু গ্রুপের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তুলে ধরে রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পূর্ণ সহযোগিতা নিয়ে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশেষ করে খাগড়াছড়ির পানছড়ি এবং রাঙ্গামাটির সাজেক ও কাউখালীসহ আরো কিছু স্থানে সশস্ত্র সন্ত্রাস চালাচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

“গত সেপ্টেম্বর মাসে জেএসএসের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের এলোপাতাড়ি ব্রাশফায়ারে কস্মিতা ত্রিপুরা নামে ৭ বছর বয়সী শিশু বাম হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছে। গত ২৯ সেপ্টেম্বর রাঙামাটির সাজেকের মাজলঙ নোয়াপাড়া এলাকায় এ ঘটনাটি ঘটেছে।

সাজেকের মাজলঙ নোয়াপাড়া এলাকায় জেএসএস সন্তু গ্রুপের গুলিতে আহত কস্মিতা ত্রিপুরা (৭)। 

জেএসএসের সশস্ত্র সদস্যদের হাতে অপহরণের শিকার হয়েছেন তিন গ্রামবাসী এবং শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এক গ্রাম কার্বারীসহ আরো তিন জন। অপহরণের শিকার হওয়া দুই যুবকের ওপরও অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন চালিয়েছে জেএসএস সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনাগুলো ঘটেছে খাগড়াছড়ির পানছড়িতে।

এছাড়া বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পূর্ণ সহযোগিতায় জেএসএস-এর সশস্ত্র গ্রুপগুলো রাঙামাটির সাজেক ও খাগড়াছড়ির পানছড়িতে ব্যাপকভাবে সশস্ত্র সন্ত্রাস চালাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অপরদিকে,  রাঙামাটির সাপছড়ি ও বন্দুকভাঙা এলাকার কিছু কিছু জায়গায়ও একই কায়দায় তারা সশস্ত্র তৎপরতা চালাচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে। সেখানে তারা অপহরণ, চাঁদাবাজিসহ সাধারণ জনগণকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।”

রিপোর্টে ঠ্যাঙাড়ে সন্ত্রাসীদের অপরাধমূলক তৎপরতার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, “পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সৃষ্ট ঠ্যাঙাড়ে সন্ত্রাসীদের অপরাধমূলক তৎপরতাও অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এখন তাদেরকে অপারেশনে নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে ব্যবহার করছে।

গত সেপ্টেম্বর মাসে খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি বাজার থেকে ঠ্যাঙাড়ে সন্ত্রাসীদের হাতে অংক্যজাই মারমা নামে এক ব্যক্তি অপহরণের শিকার হন। পরে এলাকার জনগণের প্রতিরোধের মুখে সন্ত্রাসীরা তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।

অন্যদিকে লক্ষীছড়িতে সাধারণ বাঁশ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবির অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

এছাড়া ঠ্যাঙাড়ে সন্ত্রাসীদের সাথে নিয়ে সেনা অপারেশন পরিচালনা করা, তাদেরকে দিয়ে খুন, অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালানোর অভিযোগ রয়েছে।

ভূমি বেদখলের ঘটনা তুলে ধরে রিপোর্টে বলা হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে সেটলার কর্তৃক ভূমি জবরদখলের ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে।

রাঙামাটির কাউখালীতে পাহাড়িদের জায়গা দখল করে বাঁশ কেটে নিয়ে যাচ্ছে সেটলাররা।

গত সেপ্টেম্বর মাসে তিনটি স্থানে ভূমি বেদখলের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার কলমপতি ও ঘাগড়া ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী বটতলীর লেগুছড়িতে উসিপ্রু মারমা ও অংসাইথোয়াই মারমার জায়গা বেদখল করা ও তাদের জমি থেকে জোরপূর্বক গাছ-বাঁশ কেটে নিয়ে যাওয়া; খাগড়াছড়ির গামারিঢালায় পাহাড়ি মালিককে নিজের রেকর্ডভুক্ত জমিতে ঘর তুলতে সেটলারদের বাধা প্রদান; লংগদুর ভাইবোনছড়ায় সেটলার কর্তৃক পাহাড়িদের জমি দখলের ঘটনা।

মূলত রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণের কারণে বহিরাগত সেটলাররা সুযোগ পেলেই পাহাড়িদের জায়গা-জমি বেদখল করে থাকে। আর এতে বাধা দিতে গেলেই তারা সাম্প্রদায়িক সহিংসতা সৃষ্টি করতেও দ্বিধাবোধ করে না।



This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More