ইউপিডিএফের ওপর নতুন করে দমন-পীড়ন বৃদ্ধি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হতে পারে

- লেখা: শশাঙ্ক চাকমা
পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি জেলাজুড়ে গত কয়েক দিনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, জেএসএস (সন্তু) এবং ঠ্যাঙাড়ে গোষ্ঠীর যোগসাজশে ইউপিডিএফ-এর ওপর যে ধারাবাহিক হামলা, আটক ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে, তা কেবল পাহাড়ের জন্য নয়, বরং সমগ্র দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির জন্য চরম অশনিসংকেত। গত ২৪ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে রামগড়, দীঘিনালা ও গুইমারায় রাজনৈতিক কর্মী হত্যা, গুলিবিদ্ধ হওয়া ও আটকের ঘটনা পার্বত্য অঞ্চলের প্রশাসনের দুর্বলতা, বিচারহীনতা ও জবাবদিহিতার চরম সংকটকে আবারও জনসম্মুখে নিয়ে এসেছে।
রামগড়ের প্রেমতলায় সেনাবাহিনীর গুলিতে ববিন ত্রিপুরা নামে এক ইউপিডিএফ কর্মীর মৃত্যু এবং আরেকজন কর্মীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। এর সাথে যুক্ত হয়েছে গুইমারার পাইনং পাড়ায় ইউপিডিএফ সংগঠক ঝিমিত চাকমার ওপর অতর্কিত হামলা; তিনি বর্তমানে প্রশাসনের হেফাজতে চিকিৎসাধীন। একই সময়ে দীঘিনালার বাবুছড়ায় জেএসএস (সন্তু) গ্রুপের সশস্ত্র হামলায় সুজন চাকমার প্রাণহানি এই অঞ্চলকে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের নতুন পর্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকট কোনো সামরিক সমস্যা নয়, এটি মূলত একটি দীর্ঘস্থায়ী ভূমি সমস্যা, যা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। পাহাড়ের মানুষের ভূমি অধিকার, আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং জুম্ম জনগণের জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইকে কেন্দ্র করেই এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। ইউপিডিএফ পার্বত্য অঞ্চলে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে এই গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন পরিচালনা করে আসছে। রাষ্ট্রযন্ত্র এই রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানের পথ হিসেবে আলোচনার বদলে শক্তি প্রয়োগের কৌশল বেছে নিয়েছে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী—পৃথিবীর যেখানেই নিপীড়িত মানুষ নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করেছে, সেখানেই দমন-পীড়ন আন্দোলনের আগুনকে নিভিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে আরও প্রজ্বলিত করেছে। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বুলেট দিয়ে জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে স্তব্ধ করা যায় না। বরং এই আত্মত্যাগই আন্দোলনকে গণমানুষের হৃদয়ে আরও গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত করে, যা আজ ইউপিডিএফ-এর ক্ষেত্রেও সত্য হচ্ছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে একাধিক আঞ্চলিক দল থাকলেও কেন কেবলমাত্র ইউপিডিএফ টার্গেট? এর কারণ হচ্ছে—আপাতদৃষ্টিতে পাহাড়ে একাধিক রাজনৈতিক দল বিদ্যমান থাকলেও, প্রকৃতপক্ষে আদর্শগতভাবে সেখানে কেবল দুটি পক্ষ রয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে নিপীড়িত পাহাড়ি জনগণের স্বপক্ষ শক্তি, আর দ্বিতীয়টি দখলদার গোষ্ঠী। প্রথম পক্ষের দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে জনগণের সাথে ইউপিডিএফ; আর দ্বিতীয়টির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে রাষ্ট্রযন্ত্র, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, জেএসএস (সন্তু) ও ঠ্যাঙাড়ে গোষ্ঠী। ইউপিডিএফকে নির্মূল করার জন্য তারা সকলে আজ এক বিন্দুতে মিলিত হয়েছে। জেএসএস (সন্তু)-কে বিনা নির্বাচনে তিন দশকের কাছাকাছি সময় ধরে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারের বিনিময়ে কার্যত ‘খুনের টেন্ডার’ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু কেবলমাত্র ভিন্ন মতাদর্শের কারণে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রকাশ্যে যখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গুলি করে রাজনৈতিক কর্মীদের হত্যা করে, তখন এটি স্পষ্ট যে রাষ্ট্রীয় বাহিনী তার নৈতিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর মূল দায়িত্ব জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন চালানো নয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ফেরাতে হলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর অলিখিত নিষেধাজ্ঞা এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ছত্রছায়ায় ঠ্যাঙাড়ে গোষ্ঠীর তৎপরতা বন্ধ করতে হবে।
আজকের এই চরম দুঃসময়ে ইউপিডিএফ কর্মীদের মনোবল ও সংকল্প পাহাড়ের সাধারণ মানুষের শক্তির প্রধান উৎস। এই ত্যাগ কখনো বৃথা যাবে না। পাহাড়ের এই রক্তক্ষরণ রোধে অবিলম্বে এসব হত্যাকাণ্ডের বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। নতুবা, এই সংকট রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে আরও বিপন্ন করে তুলবে।
২৭.০৬.২০২৬
* লেখক একজন সচেতন নাগরিক
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
