মুক্তমত
পার্বত্য জেলা পরিষদ : শাসকগোষ্ঠীর বিভাজনের হাতিয়ার

সোহেল চাকমা
গত ২০ আগস্ট ২০২৬, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক ঘোষণার মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা পরিষদগুলো পুনর্গঠন করা হয়েছে। পূর্বের ন্যায় এবারেও নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বাইরে রেখে পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোতে সরকার-শাসকগোষ্ঠী নিজেদের পছন্দসই বা অনুগত ব্যক্তিদের সিলেকশনের মাধ্যমে পরিষদগুলো পুনর্গঠন করল। এর অর্থ দাঁড়ায়, সরকার বা শাসকগোষ্ঠী চায় না পাহাড়িরা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোট দিয়ে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বা সদস্য পদে নির্বাচিত করুক। এতে সরকার-শাসকগোষ্ঠীর পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কিছুটা হ্রাস পেতে পারে এবং একই সাথে পাহাড়িদের বিভাজিত করে রাখার চক্রান্ত ভেস্তে যেতে পারে- এখানেই যেন শাসকগোষ্ঠীর বড় ভয়!
১৯৮৯ সালে স্বৈরশাসক এরশাদ-এর সময়ে গঠিত ‘পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ’ ৯৭ সালে সম্পাদিত পার্বত্য চুক্তির মধ্য দিয়ে ‘পার্বত্য জেলা পরিষদ’ নামে সংশোধন করা হয়। পরিষদের আইনে পাহাড়িদের ‘উপজাতি’ নামে সম্বোধন করার বিধান রয়েছে। খোদ পার্বত্য চুক্তির ১নং ধারায় পার্বত্য চট্টগ্রামকে ‘উপজাতীয় অধ্যুষিত অঞ্চল’ হিসেবে চিহ্নিত বা বিবেচনা করতে তৎকালীন আওয়ামী সরকার ও জেএসএস সম্মত হয়েছেন। যা ছিল আপামর পাহাড়ি জনগণের জন্য চরম অপমানজনক। তার চাইতেও ভয়াবহ ব্যাপার হলো- জেলা পরিষদ আইনের মাধ্যমে আশির দশকে পুনর্বাসিত সেটলার বাঙালিদের পাহাড়ের স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তা জনসংহতি সমিতি বা জেএসএসও মেনে নিয়েছে।
পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের ৩ নং ধারায় বলা হয়েছে- “অ-উপজাতীয় স্থায়ী বাসিন্দা” বলিতে যিনি উপজাতীয় নহেন এবং যাহার পার্বত্য জেলায় বৈধ জায়গা জমি আছে এবং যিনি পার্বত্য জেলায় সুনির্দিষ্ট ঠিকানায় সাধারণত বসবাস করেন তাহাকে বুঝাইবে। এর সোজা অর্থ হচ্ছে, সেটলাররা অ-উপজাতীয় কিন্তু পাহাড়ে পুনর্বাসনের মাধ্যমে সরকারী নথিপত্রে বা লিস্ট দিয়ে তাদেরকে বৈধ জায়গা জমি দেয়া হয়েছে। সেই অর্থে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী বাসিন্দা। সেজন্য সেটলাররাও জেলা পরিষদে সদস্য পদ পাবার যোগ্য এবং তা জেলা পরিষদ আইনে স্বীকৃত ও ন্যায়সঙ্গতও। ভেবে দেখুন, সেটলারদের পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে মেনে নিয়ে জেএসএস কোন আক্কেল-জ্ঞানে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে এবং চুক্তিতে পাহাড়ি জনগণের স্বার্থ কোথায় ?
পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠনের পর থেকে দীর্ঘ ৩৭ বছর ধরে কোন নির্বাচন হয়নি। অথচ জেলা পরিষদ সংশোধনী আইনে পাঁচ বছর পর পর নির্বাচন হওয়া কথা! সরকার-শাসকগোষ্ঠী একচ্ছত্রভাবে নিজেদের অনুগত ব্যক্তিদের দিয়ে জেলা পরিষদ পুনর্গঠন করে আসছে। এই অনির্বাচিত জেলা পরিষদগুলোর মাধ্যমে শাসকগোষ্ঠী পাহাড়িদের বিভাজিত করে রাখার ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করছে। সরকার দলীয় অনুগত ব্যক্তি, দালাল-প্রতিক্রিয়াশীলদের জেলা পরিষদে পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে শাসকগোষ্ঠী একদিকে জাতিগত বিভাজনকে উস্কে দিচ্ছে অন্যদিকে সুবিধাবাদী, সুবিধাভোগী ও দাসত্ববরণকারী প্রজন্ম তৈরী করছে। ফলে পাহাড়িদের মধ্যে সুবিধাবাদী-প্রতিক্রিয়াশীলদের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি শাসকগোষ্ঠীর অনুগামী একটি শ্রেণী তৈরী হচ্ছে। এই শ্রেণিটি পাহাড়ের প্রকৃত অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করছে না, বরং নিজেদের স্বার্থে তারা জাতীয় মুক্তির আন্দোলনে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াচ্ছে। জেলা পরিষদ পুনর্গঠন হলে বিভিন্ন পদ-পদবীর লোভে পাহাড়িদের মধ্যে এই প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীটি নানাভাবে কান্নাকাটি করে। অথচ এই নিয়ে সাধারণ পাহাড়িদের মধ্যে কোন হাহুতাশ নেই। কারণ এতে সাধারণ পাহাড়িদের কোন স্বার্থ রক্ষিত হয়নি। এর দায় কি জেএসএস’র নেই?
অবশ্যই পার্বত্য জেলা পরিষদ নির্বাচন না হওয়াতে জেএসএসও দলীয়গত স্বার্থে লাভবান হচ্ছে। কেননা জেলা পরিষদের নির্বাচন হলে আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচনও হতে হবে। তখন ২৯ বছর ধরে অনির্বাচিতভাবে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদে আসীন থাকা সন্তু লারমা’র গদি রক্ষা করাটাই কঠিন হবে। সেই সুযোগে সেটলারদের স্থায়ী বাসিন্দা স্বীকৃতি দিয়ে, অনির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সরকার-শাসকগোষ্ঠীর অনুগত দাস হিসেবে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখাটাই সন্তু লারমা মনে করছেন বুদ্ধিমানের কাজ এবং তিনি তাই করে চলেছেন। এতে শাসক-সরকারের জুম্মদের বিভাজিত করে রাখার ষড়যন্ত্র যেমন বাস্তবায়ন হচ্ছে, একইভাবে সন্তু লারমার জেএসএসও একটা Safe Exist বা সরকারের নিরাপদ আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থেকে নিজেদের দলের স্বার্থ রক্ষা করতে পারছে।
পার্বত্য জেলা পরিষদ জুম্মদের স্বার্থ রক্ষার বদলে শাসকগোষ্ঠীর বিভাজনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তিন পার্বত্য জেলায় জেলা পরিষদ পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করলে তা প্রতীয়মান হয়। জাতিগত বিভাজন ও পাহাড়িদের পরস্পরের মধ্যে দ্বন্দ্ব-বিদ্বেষ উস্কে দেওয়ার ছাপ এখানে স্পষ্ট। এ সুযোগটি জেএসএসই শাসকগোষ্ঠীকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে নিজেদের দল টিকিয়ে রাখার স্বার্থে। প্রয়োজনে শাসকগোষ্ঠীর জুম্ম দিয়ে জুম্ম ধ্বংস করার নীলনকশা বাস্তবায়ন করে হলেও জেএসএস ক্ষমতার স্বাদ ভোগ করতে চায়। সুতরাং এটা নির্দ্বিধায় বলা চলে, জগাখিচুড়ি পাকানো জেলা পরিষদ কিংবা অপমানজনক পার্বত্য চুক্তির সুবিধা-প্রলোভন দিয়ে পাহাড়ি জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা এবং জাতীয় মুক্তি সম্ভব নয়। এতে শুধু শাসকগোষ্ঠীর দালাল-প্রতিক্রিয়াশীল সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে, পাহাড়িদের মধ্য তৈরী হবে দাসসুলভ প্রজন্ম। পার্বত্য চট্টগ্রামে আপামর জুম্ম জনগণের প্রকৃত মুক্তি পেতে হলে প্রয়োজন পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের সংগ্রাম জোরদার করা। একমাত্র পূর্ণস্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই জুম্ম জনগণের প্রকৃত মুক্তি সম্ভব।
* সোহেল চাকমা, সাধারণ সম্পাদক, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, কেন্দ্রীয় কমিটি।
[মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখাগুলো লেখক/লেখকদের নিজস্ব মতামতই প্রতিফলিত]
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
