সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির নিকট লিখিত প্রস্তাবনা পেশ করেছেন ডাকসু সদস্য হেমা চাকমা

ঢাকা প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ‘সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’র নিকট লিখিত প্রস্তাবনা পেশ করেছেন ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য হেমা চাকমা।
গতকাল মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর ২০২৬) জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে সংবিধান সংশোধন বিষয়ে কমিটির ১০ম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্র সংগঠনের সাথে কমিটি এই বৈঠকের আয়োজন করে। এতে উপস্থিত থেকে হেমা চাকমা কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের নিকট উক্ত প্রস্তাবনাটি পেশ করেন।
প্রস্তাবনায় তিনি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১, ৩, ৬(২), ১৩, ২৩ক এবং ৬৫ বিষয়ে সংশোধনীর প্রস্তাব দিয়েছেন।
হেমা চাকমা তাঁর ফেসবক পেইজে পোস্ট দিয়ে এবং প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে উক্ত বিষয়টি জানান।
গতকাল নিজের ফেসবুক পেইজে দেওয়া স্ট্যাটাসে তিনি বলেন, “ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির ১০ম বৈঠক আজ ৩ নভেম্বর ২০২৬ (মঙ্গলবার) জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বৈঠকে কমিটির সদস্য ও চীফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, জয়নুল আবেদীন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নূরুল হক, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন এবং সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন অংশগ্রহণ করেন।
সংবিধান সংশোধন কমিটির মতবিনিময় সভায় পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসী এবং ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে আমার প্রস্তাবনা বক্তব্য এবং লিখিত প্রস্তাবনা সংবিধান সংশোধন কমিটির সভাপতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদের নিকট পেশ করলাম।”
হেমা চাকমার পেশকৃত সংশোধনী প্রস্তাবনাগুলো হলো:
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১: ‘‘বাংলাদেশ একটি একক স্বাধীন ও সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র, যাহা “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ” নামে পরিচিত হইবে।’’
সংশোধনী ১: ‘‘বাংলাদেশ একটি একক, স্বাধীন ও সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র, “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ” নামে পরিচিত হইবে। তবে সংখ্যালঘু/আদিবাসী জাতি অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিশেষ স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসাবে বিশেষ আইনের মাধ্যমে পরিচালিত হইবে।’’
যৌক্তিকতা: মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের হাই কোর্ট বিভাগ পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন, ১৯৯৮ ও এর অধীনে প্রতিষ্ঠিত পরিষদকে জাতীয় সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১ এর পরিপন্থি মর্মে অসাংবিধানিক ও বে-আইনি ঘোষণা করেছে। উক্তরূপ সাংবিধানিক বিধান থাকলে এইরূপ আইন ও পরিষদ অসাংবিধানিক বিবেচিত হতো না এবং ভবিষ্যতেও হবে না। বিশেষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা হবে আইন প্রণয়ন ক্ষমতাসম্পন্ন বিশেষ স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। আর একমাত্র এই বিশেষ ব্যবস্থায় পাহাড়ি বা আদিবাসী জনগণের জাতীয় অস্তিত্ব সংরক্ষণ ও বিকাশ সম্ভব।
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩: ‘‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা।’’
সংশোধনী: “প্রজাতন্ত্রের ভাষা বাংলা। তবে বাংলা ব্যতীত দেশের ভিন্ন ভিন্ন জাতিসত্তাসমূহের ভাষার পরিপোষণ ও উন্নয়নে রাষ্ট্র সমভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করিবেন।”
যৌক্তিকতা: বাংলাদেশে বাংলা ছাড়াও আরও অনেক ভাষা রয়েছে। কিন্তু ভাষাগুলো বর্তমানে অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে। রাষ্ট্র তথা সরকারের উচিত এসব ভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬(২): “বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসেবে বাঙালী এবং নাগরিকগণ বাংলাদেশী বলিয়া পরিচিত হইবেন।’’
সংশোধনী: “বাংলাদেশের জনগণ নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশী বলিয়া পরিচিত হইবেন”
যৌক্তিকতা: বাংলাদেশে বাঙালি ছাড়াও চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, মনিপুরী, গারো, সাঁওতালসহ ভিন্ন ভাষাভাষী অন্তত ৫০টি জাতিসত্তা রয়েছে। তারাও বাংলাদেশের জনগণের অংশ, তবে তারা নিজেদের বাঙালি বলে পরিচয় দেয় না। অথচ উক্ত অনুচ্ছেদে সেটা অস্বীকার করা হয়েছে এবং বাংলাদেশকে একজাতির রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৩ এর (গ): ‘‘ব্যক্তিগত মালিকানা, অর্থাৎ আইনের দ্বারা নির্ধারিত সীমার মধ্যে ব্যক্তির মালিকানা।’’
সংযোজিত নতুন উপ-অনুচ্ছেদ ১৩(ঘ) হবে নিম্নরূপ:
“প্রচলিত প্রথা ও রীতিনীতি ভিত্তিক পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি বা আদিবাসী জাতিসত্তাসমূহের সামষ্টিক মালিকানা।”
যৌক্তিকতা: পার্বত্য চট্টগ্রামে সমষ্টিগত মালিকানা ঐতিহ্যগতভাবে বংশপরম্পরায় চলে আসছে। সংবিধানে এর স্বীকৃতি না থাকায় পাহাড়িরা তাদের ভূমি হারাচ্ছে। ভূমির উপর পাহাড়িদের ব্যক্তিগত ও সম্প্রদায়ের সমষ্টিগত মালিকানার আইনগত স্বীকৃতি একান্ত প্রয়োজন।
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৩ক: ‘‘রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’’
সংশোধনী: “জাতিসত্তা বা আদিবাসী সংস্কৃতি: রাষ্ট্র পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিসত্তাসহ সকল আদিবাসী জাতির অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং প্রথা সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।”
যৌক্তিকতা: “উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী” এই অভিধাগুলো যথার্থ ও গ্রহণযোগ্য নয়। তার পরির্বতে ‘‘আদিবাসী’’, ‘‘পাহাড়ি’’, “জাতি” বা ‘‘জাতিসত্তা’’ ব্যবহার করা যেতে পারে।
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৫ (৩ক):
‘‘সংবিধান (সপ্তদশ সংশোধন) আইন, ২০১৮ প্রবর্তনকালে বিদ্যমান সংসদের অব্যবহিত পরবর্তী সংসদের প্রথম বৈঠকের তারিখ হইতে শুরু করিয়া পঁচিশ বৎসরকাল অতিবাহিত হইবার অব্যবহিত পরবর্তীকালে সংসদ ভাংগিয়া না যাওয়া পর্যন্ত পঞ্চাশটি আসন কেবল মহিলা-সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত থাকিবে এবং তাঁহারা আইনানুযায়ী পূর্বোক্ত সদস্যদের দ্বারা সংসদে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির ভিত্তিতে একক হস্তান্তরযোগ্য ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হইবেন।
তবে শর্ত থাকে যে, এই দফার কোন কিছুই এই অনুচ্ছেদের (২) দফার অধীন কোন আসনে কোন মহিলার নির্বাচন নিবৃত্ত করিবে না।’’
সংযোজিত নতুন উপ-অনুচ্ছেদ ৬৫ (৩খ) হবে নিম্নরূপ:
“পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় পাহাড়ি/আদিবাসী জাতিসমূহের জন্য ১টি মহিলা আসনসহ ৪টি আসন সংরক্ষিত থাকিবে এবং উক্ত আসনসমূহের সংসদ সদস্যগণ কেবলমাত্র পাহাড়ি/আদিবাসী ভোটারদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হইবেন। তাহারা অন্য সংসদ সদস্যদের অনুরূপ সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার ভোগ করিবেন।’’
যৌক্তিকতা: রাষ্ট্র যেহেতু স্বীকার করেছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত পাহাড়ি/আদিক জাতিগুলো বাঙালির চাইতে অনগ্রসর রয়েছে, তাই তাদের সার্বিক বিকাশের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা প্রয়োজন এবং জাতীয় সংসদে তাদের প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা এই বিশেষ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। সংসদে একমাত্র তাদের জন্য আসন সংরক্ষণ করেই এই প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হতে পারে। বর্তমানে বিভিন্ন জাতীয় রাজনৈতিক দল থেকে মনোনয়ন নিয়ে পাহাড়িরা সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছেন সত্য। কিন্তু সব সময় তারা জাতীয় রাজনৈতিক দল থেকে মনোনয়ন লাভ করবেন তার কোন নিশ্চয়তা নেই । বাংলাদেশের নারীরা যুগ যুগ ধরে পশ্চাদপদ ছিলেন বলে সংসদে তাদের জন্য সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে তাদের জন্য এই ব্যবস্থা রাখার ফলে তারা আজ বিভিন্ন দিক দিয়ে অনেক অগ্রসর হয়েছেন। একই কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের অবহেলিত ও অধিকার বঞ্চিত পাহাড়িদের জন্যও তাই করা প্রয়োজন।
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
