গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের ৭ম কেন্দ্রীয় কাউন্সিল সম্পন্ন : ১৫ সদস্যের নতুন কমিটি গঠিত
সাজেকবাসীর আন্দোলনের সমর্থনে ৪ নভেম্বর চট্টগ্রামে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা

নিজস্ব প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
“কাপুরুষতা নয়, জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষায় বজ্রকঠিন শপথে জেগে ওঠো যুব শক্তি” এই আহ্বানে এবং বিএনপি সরকার কর্তৃক গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক তিনটি কমিটি- জাতীয়, নির্বাহী ওপরামর্শক কমিটি বাতিলের দাবিকে সামনে রেখে গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের ৭ম কেন্দ্রীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে তনুময় চাকমাকে সভাপতি, থুইনুমং মারমাকে সাধারণ সম্পাদক ও রুপান্ত চাকমাকে সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত করে ১৫ সদস্য বিশিষ্ট নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কাউন্সিল শেষে আয়োজিত এক সমাবেশ থেকে সাজেকবাসীর আন্দোলন ও দাবির সমর্থনে আগামী ৪ নভেম্বর চট্টগ্রাম মহানগরে বিক্ষোভ মিছিলের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
আজ শুক্রবার (৩০ অক্টোবর ২০২৬) লক্ষীছড়ির হুদুকছড়ি এলাকায় সকাল সাড়ে ৯টা থেকে দিনব্যাপী এ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিল অধিবেশন শুরুর আগে ‘আমরা করব জয়’ সংগীতের মাধ্যমে সংগঠনের পতাকা উত্তোলন করা হয়।
গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় সভাপতি জিকো ত্রিপুরার সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক বরুণ চাকমার সঞ্চালনায় কাউন্সিল অধিবেশন বক্তব্য রাখেন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)-এর সংগঠক থুইক্যচিং মারমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘের কেন্দ্রীয় সভাপতি কণিকা দেওয়ান, বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি)-এর কেন্দ্রীয় সভাপতি সমর চাকমা ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রিতা চাকমা। স্বাগত বক্তব্য রাখেন গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক রুপন মারমা। এছাড়া মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক শ্যামল চাকমা।

কাউন্সিল অধিবেশনে ইউপিডিএফ সংগঠক থুইক্যচিং মারমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের নেতৃত্বে যুব সমাজকে সোচ্চার হতে হবে।
তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি জনগণের ওপর দমন-পীড়নের ঘটনা তুলে ধরে বলেন, বান্দরবানে ব্যাংক ডাকাতির ঘটনাকে কেন্দ্র করে মিথ্যা অভিযোগে যে নিরীহ বম জাতিসত্তার লোকজনকে আটক করা হয়েছে তাদের অনেককে এখনো পর্যন্ত কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়েছে। তাদেরকে পরিকল্পিতভাবে জামিন দেওয়া হচ্ছে না। অপরদিকে একইভাবে ইউপিডিএফের নেতা-কর্মীদেরকেও মিথ্যা মামলা দিয়ে বছরের পর বছর কারাগারে আটক রাখা হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন জায়গায় সেনাবাহিনী অপারেশনের নামে নিরীহ জনগণের ঘরবাড়িতে তল্লাশি, লুটপাট চালাচ্ছে, হয়রানি করছে। সম্প্রতি সাজেকে শান্তিপূর্ণ অবরোধ কর্মসূচিতে হামলা চালিয়ে ৭০ জনের অধিক নারী-পুরুষকের আহত করা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, সমতলেও আন্দোলন সংগ্রাম জারি রেখেছে। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে এগিয়ে আসার জন্য যুব সমাজের প্রতি আহ্বান জানান।
কণিকা দেওয়ান বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার জন্য আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াই সংগ্রাম করতে হবে। ছাত্র-যুবকদের পাশাপাশি নারীদেরও আন্দোলনে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের জাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখান জন্য নারীদেরকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশে নারী নির্যাতনের ঘটনা তুলে ধরে তিনি বলেন, নারী ধর্ষণ-নির্যাতন কেবল পাহাড়ে নয়, বর্তমানে সমতলেও এ ধরনের ঘটনা বেড়ে চলেছে। সরকার ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে না পারায় প্রতিনিয়ত এ ধরনের ঘটনা ঘটছে।

কণিকা দেওয়ান আরও বলেন, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামকে যুব সমাজের একটি অগ্রগামী সংগঠন হিসেবে আরো বেশি সুসংগঠিত করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি বেদখলসহ সকল অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে যুব ফোরামের নেতৃত্বে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তিনি সাজেকবাসীর ন্যায্য আন্দোলনকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে এবং পাহাড়ে নিপীড়ন-নির্যাতনের ঘটনা আড়ল করতে নানা মিথ্যা, বানোয়াট তথ্য ছড়িয়ে গুজব ছড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন।
ছাত্রনেতা সমর চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে যে কঠিন পরিস্থিতি চলছে এর মধ্যেও যুবসমাজকে সংগঠিত করতে আজকের যুব ফোরামের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তাই এ কাউন্সিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, আমরা যারা সংগঠনের কাজ করছি প্রত্যেককে পার্বত্য চট্টগ্রামের লড়াই সংগ্রামের ইতিহাস জানতে হবে। সেই মোঘল, ব্রিটিশ আমল থেকে আমরা এখনো পর্যন্ত লড়াই সংগ্রাম করে যাচ্ছি।

তিনি আরও বলেন, আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসত জাতিসত্তাগুলো নিজস্ব অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই। কিন্তু এদেশের শাসকগোষ্ঠী আমাদেরকে অধিকারহীন করে রেখে আমাদের ওপর দমন-পীড়ন জারি রেখেছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও পাহাড়িরা নিপীড়ন থেকে মুক্তি পায়নি। স্বাধীনতার পর তৎকালীন পাহাড়ি নেতারা সরকারের কাছে স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানালেও সরকার তা মেনে নেয়নি। আমাদের জাতিসত্তার স্বীকৃতি না দিয়ে বাঙালি হতে বলা হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের ওপর ডজনের অধিক গণহত্যা ও অসংখ্য সাম্প্রদায়িক হামলা সংঘটিত করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচনা করে সমর চাকমা বলেন, বর্তমান বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পার্বত্য চট্টগ্রামে ১০০% মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করা সম্ভব নয় বলার পর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি জনগণের ওপর দমন-পীড়ন আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিনিয়ত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি সাজেকে শান্তিপূর্ণ অবরোধে সেনাবাহিনী হামলা, লাঠিপেটা করে ৭০ জনের অধিক নারী-পুরুষকে আহত করেছে। উজোবাজারে দোকানপাট-বসতবাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে। সাজেকবাসীর ন্যায্য দাবি মেনে না নিয়ে এ ধরনের হামলা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে নিপীড়িত জাতিসত্তাগুলোর প্রকৃত অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য চলমান পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের লড়াইয়ে সামিল হওয়ার জন্য ছাত্র-যুব সমাজের প্রতি আহ্বান জানান।
রিতা চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতিতে যুব সমাজকে সোচ্চার হতে হবে। যুবকরা হলেন একটি জাতির কান্ডারি। কিন্তু আমরা প্রায়ই দেখি আমাদের পাহাড়ি যুবকরা বিভিন্ন মাদক ও জুয়ায় আসক্ত হয়ে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এধরনের অবক্ষয় থেকে যুব সমাজকে মুক্ত থেকে জাতির অস্তিত্ব রক্ষার্থে লড়াই সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে হবে।
তিনি সাজেকে চলমান পরিস্থিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে সাজেকবাসীর আন্দোলনের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন এবং সাজেকের জনগণের ন্যায্য দাবি মেনে নিয়ে চলমান সংকট নিরসনের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
তিনি পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত লড়াই-সংগ্রাম জারি রাখতে ছাত্র-যুব-নারী সমাজসহ জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।
স্বাগত বক্তব্যে রুপন মারমা বলেন, যুব সমাজকে পার্বত্য চট্টগ্রামে পূর্ণস্বায়ত্তশাসন অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত লড়াই জারি রাখতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে রাঙামাটির সাজেকে শান্তিপূর্ণ সড়ক অবরোধে সেখানকার যুব সমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন। তিনি সাজেকবাসীর ন্যায্য আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানান।
তিনি বলেন, চব্বিশে গণঅভ্যুত্থানে আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামে কিছুটা হলেও শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে মনে করেছিলাম। কিন্তু এদেশের শাসকগোষ্ঠী তার পরিবর্তে আমাদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলাসহ অন্যায় দমন-পীড়ন চাপিয়ে দিয়েছে। তাই আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সকল পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে এবং লড়াই-সংগ্রাম জোরদার করতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে জিকো ত্রিপুরা বলেন, আপনারা নিশ্চয় জানেন নিজেদের দাবি আদায় ও নিরাপত্তার জন্য সাজেকবাসী অবরোধ কর্মসূচি জারি রেখেছেন। তাদের এই আন্দোলন ন্যায্য। কিন্তু সরকার তাদের দাবি-দাওয়া মেনে নিতে চাচ্ছে না। তাই আমাদের সকলকে সাজেকবাসীর আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানাতে হবে।
তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাামে জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ছাত্র-যুব-নারীদেরকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
কাউন্সিলের দ্বিতীয় অধিবেশনে গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের সভাপতি জিকো ত্রিপুরা পুরনো কমিটি বিলুপ্ত করে ১৫ সদস্যের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করেন। এতে তনুময় চাকমাকে সভাপতি, থুইনুমং মারমাকে সাধারণ সম্পাদক ও রুপান্ত চাকমা সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। নতুন কমিটির সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করান জিকো ত্রিপুরা।
পরে তৃতীয় পর্বে নতুন কমিটির সভাপতি তনুময় চাকমার সভাপতিত্বে ৭ম কাউন্সিল অধিবেশন শেষ হয়।
কাউন্সিল অধিবেশন শেষে একটি মিছিল বের করা হয়। মিছিল শেষে অনুষ্ঠিত সংক্ষিপ্ত সমাবেশে তনুময় চাকমা বক্তব্য প্রদান করেন।

তিনি গত ২২ অক্টোবর সাজেকে শান্তিপূর্ণ সড়ক অবরোধে সেনাবাহিনীর হামলা, লাঠিচার্জ, দোকানপাট ভাঙচুর ও গুলিবর্ষণের ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান এবং সাজেকবাসীর চলমান অবরোধ ও আন্দোলনের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেন।
তিনি অবিলম্বে সাজেকবাসীর ৫ দফা দাবি মেনে চলমান সংকট নিরসনের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
সমাবেশ থেকে তিনি সাজেকবাসীর ন্যায্য দাবি ও আন্দোলনের সমর্থনে আগামী ৪ নভেম্বর ২০২৬ চট্টগ্রাম মহানগরে বিক্ষোভ মিছিলের ঘোষণা দেন এবং উক্ত কর্মসূচি সফল করার আহ্বান জানান।
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
