গুইমারা রামেসু বাজারে সেনা-সেটলার হামলা-হত্যাকাণ্ডের ১ বছর : হামলাকারীদের গ্রেফতার-বিচার কিছুই হয়নি

0
২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর গুইমারা রামেসু বাজারে সেনা-সেটলার হামল, অগ্নিসংযোগ, হতাহতের চিত্র। ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিনিধি, সিএইচটি নিউজ
সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

খাগড়াছড়ির গুইমারা উপজেলার রামেসু বাজারে গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর পাহাড়িদের ওপর বর্বরোচিত সাম্প্রদায়িক হামলা ও হত্যাকাণ্ড চালায় সেনাবাহিনী ও সেটলার বাঙালিরা। এই হামলায় ৩ জন মারমা যুবক নিহত হন এবং গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর জখমসহ আহত হন অন্তত অর্ধশত পাহাড়ি। এছাড়া ৮০টির অধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ঘরবাড়ি এবং ১৮টির মতো মোটর সাইকেল ও মাহেন্দ্র গাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী গঠিত ড. ইউনূসের অন্তর্বতীকালীন সরকারের সময়ে এটি ছিল ৬ষ্ঠ দফায় পাহাড়িদের ওপর নৃশংস হামলার ঘটনা।

পূর্ব পরিকল্পিত ও ভয়াবহ এই হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি আজ (২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬) এক বছর পূর্ণ হলেও হামলায় জড়িত সেনা-সেটলারদের আইনের আওতায় আনা হয়নি এবং ঘটনার কোন বিচারও হয়নি।

ঘটনার সূত্রপাত

২৩ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ির সিঙ্গিনালায় মারমা কিশোরীকে ধর্ষণের ঘটনায় সকল ধর্ষককে গ্রেফতার ও বিচার এবং ২৭ সেপ্টেম্বর অবরোধ পালনকালে খাগড়াছড়ি শহরে সেটলার হামলার প্রতিবাদে জুম্ম ছাত্র জনতার ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী ২৮ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টা থেকে গুইমারা এলাকার ছাত্র জনতা রামেসু বাজার এলাকায় টাউন হলের সামনে সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে ও গাছের গুড়ি ফেলে অবরোধ পালন শুরু করে। পরে সকাল সাড়ে ১০টার সময় গুইমারা ব্রিগেড থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একদল সদস্য সেখানে এসে উপস্থিত হয়। তারা ১৪৪ ধারা জারির কথা বলে ছাত্র জনতাকে অবরোধ তুলে নিতে চাপ দেয়। তারা ধর্ষণে অভিযুক্ত একজনকে আটক করে রিমাণ্ডে নেয়া হয়েছে বলে অবরোধকারীদের জানায়। তবে অবরোধকারীরা সেটা যথেষ্ট নয় এবং লোকদেখানো বলে মন্তব্য করেন। তারা ধর্ষণের বিচার দাবিতে শ্লোগান দিয়ে অবরোধ কর্মসূচি পালন করতে থাকেন। এমতাবস্থায় সেনাবাহিনীর সদস্যরা অবরোধকারী ছাত্র জনতার ভিতর ঢুকে পড়ে এবং লাঠিচার্জ করে তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দিলে ঘটনার সূত্রপাত ঘটে।

এরপর সেনাবাহিনীর সাথে বিক্ষুব্ধ ছাত্র জনতার কয়েক দফা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এমতাবস্থায় গুইমারা বাজার ও জালিয়া পাড়াসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে সেটলার বাঙালিদের সেখানে নিয়ে আসা হয়। একই সাথে সেনাসৃষ্ট ঠ্যাঙাড়ে সন্ত্রাসীদের একটি সশস্ত্র দলকেও সেখানে আনা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এক পর্যায়ে সেনাবাহিনীর সদস্যরা বিক্ষুব্ধ ছাত্র জনতার ওপর নির্বিচার গুলি চালায়, অন্যদিকে সেটলাররা রামেসু বাজারে গিয়ে ব্যাপক লুটপাট চালানোর পর দোকানপাট ও বসতবাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়। মুহুর্তের মধ্যেই রামেসু বাজার এলাকা মৃত্যুপুরিতে পরিণত হয়। মানুষ নিজেকে রক্ষায় যে যেদিকে পারে সরে যেতে থাকে। অনেকে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। সেনাবাহিনীর গুলিতে ঘটনাস্থলে তিন জন নিহত হন এবং অনেকে আহত হন।

উহ্লামে মারমা (১৪) নামে ১০ম শ্রেণির এক ছাত্রীকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে তার বাবা কোলে করে নিয়ে যাওয়ার সময় ধারণ করা একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে হামলার ভয়াবহতা প্রকাশ পায়। ওই ছাত্রী সেটলারদের আক্রমণে মাথায় আঘাত পেয়ে আহত হয়েছিলেন। হত্যার উদ্দেশ্যে তার মাথায় আঘাত করা হয়েছিল বলে জানা যায়।

বর্বরোচিত এ হামলায় সেনাবাহিনীর নির্বিচার গুলিতে সেদিন নিহত হন আখ্র মারমা (২৪), আথুইপ্রু মারমা (২৬) ও থৈইচিং মারমা (২৫)।

এছাড়া গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন মানসিক প্রতিবন্ধী নারীসহ অর্ধশত পাহাড়ি। যাদের মধ্যে গুরুতর জখম হওয়া অনেকে এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। তাদের এখনো চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

সেটলারদের অগ্নিসংযোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয় রামেসু বাজারের ১৫টি প্লটের ৫০টির অধিক দোকান, ১৫টি বসতবাড়ি, ১৬টি ভাড়া বাসা, ১টি বেসরকারি অফিস, ১টি হলুদের গোডাউন (বাঙালি মালিকানাধীন), ১৭টি মোটর সাইকেল ও ১টি মাহিন্দ্র (থ্রি হুইলার) গাড়ি। ভাঙচুর করা হয় অনেক বসতবাড়ি। বাজারে অগ্নিসংযোগের আগে সেটলাররা দোকান ও বাড়িঘরে ব্যাপক লুটপাট চালায়। তারা লুণ্ঠিত মালামাল ভ্যানগাড়িতে করে নিয়ে যায় বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন। রামেসু বাজার ও আশে-পাশের বসতবাড়িতে অগ্নিসযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ফলে কয়েক কোটি টাকার আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয় পাহাড়িরা।

সেটলারদের লাগিয়ে দেওয়া আগুনে পুড়ে যাওয়া ঘরবাড়ি। ফাইল ছবি

হামলার পর সেনারা তাদের সৃষ্ট সশস্ত্র ঠ্যাঙাড়ে সন্ত্রাসীদেরকে (মোত্তালেব বাহিনী নামেও পরিচিত) পুড়ে যাওয়া রামেসু বাজারে পাহারায় রেখে নিজেরা সেখান থেকে সরে পড়ে। ফলে ঠ্যাঙাড়েদের ভয়ে স্থানীয় লোকজন নিহত-আহতদের উদ্ধার করতে যেতে পারেনি। পরে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসনকে অবগত করা হলে সেদিন বিকালে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে উক্ত ৩ জনের মরদেহ উদ্ধার করে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়।

ঘটনার পরদিন (২৯ সেপ্টেম্বর) রাতে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতাল থেকে মরদেহ বাড়িতে নিয়ে আসা হলে রাতের মধ্যে সৎকার করতে চাপ দেয় সেনা-প্রশাসন। এতে ভয়ে এলাকাবাসী ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতি পুরোপুরি অনুসরণ না করে মধ্যরাতে মরদেহগুলো দাহ করতে বাধ্য হন।

হামলা ও অগ্নিসংযোগে জড়িত সেটলারদের মধ্যে যাদের নাম জানা যায় তারা হলেন ১. বিশ্বজিৎ (মুদি দোকানদার ও ধান ব্যবসায়ী+লেবার ২ জন) গুইমারা; ২. আবু, ডাক্তার টিলা (ওয়েল্ডিং মেস্ত্রি; ৩. দিলীপ, ডাক্তার টিলা (তেলের   দোকানদার) গুইমারা; ৪. খোকন (মুদি দোকানদার) গুইমারা; ৫. রাসেল, বাবুল মেম্বার পাড়া (মুদি দোকানদার) গুইমারা বাজার; ৬. টপু, পিতা: মতিউর রহমান, বাজার পাড়া (নূর ফার্মেসি) গুইমারা বাজার; ৭. রনজিত, কলেজ রোড (গজা বিক্রেতা) গুইমারা বাজার; ৮. মো. সোহাগ (৩৫), মুসলিম পাড়া (ফল ব্যবসায়ী) গুইমারা; ৯. আরমান (৩৮), পিতার নাম মৃত আমির হোসেন, জালিয়া পাড়া গুইমারা; ১০. জালাল (৫০) হলুদ ব্যবসায়ী, আমতলী পাড়া, গুইমারা; ১১. তরফ আলী (৪৮), জালিয়াপাড়া, গুইমারা; ১২. মাহবুব আলী (গাছ ব্যবসায়ী) বড়পিলাক, গুইমারা; ১৩. আলী হোসেন (২৬), মুসলিম পাড়া, গুইমারা;  ১৪. বেলাল (৪০) মুসলিম পাড়া, গুইমারা; ১৫. রবিউল, মুসলিম পাড়া, গুইমারা; ১৬. দুলাল, মুসলিম পাড়া, গুইমারা, খাগড়াছড়ি, ১৭. কামাল মুসলিম পাড়া গুইমারা; ১৮.রবিউল (সভাপতি গুইমারা মোটর সাইকেল চালক সমিতি), গুইমারা বাজার; ১৯. রবিউল ২২ মুসলিম পাড়া গুইমারা; ২০. আরিফুল ইসলাম আরিফ, গুইমারা, খাগড়াছড়ি (ওয়ার্কশপের দোকানদার);  ২১. মো. ইউসুফ পিতার নাম জাহাঙ্গীর, জালিয়াপাড়া, গুইমারা;  ২২. আবুল কাসেম (৬৫), পিতার নাম তালেব, জালিয়াপাড়া, গুইমারা; ২৩. বেলাল (ওয়ার্কশপের দোকানদার) গুইমারা; ২৪. বেলাল (ওয়ার্কশপের দোকানদার); ২৫.রুহুল আমিন, (মুদি দোকানদার) গুইমারা; ২৬. লতিফ (সারের দোকানদার), গুইমারা বাজার; ২৭. মিজান (মুদি দোকানদার), গুইমারা; ২৮.তরুণ (কসমেটিক দোকানদার), গুইমারা;  ২৯. ইমন (ক্রোকারিজ দোকান); ৩০. মোশাররফ, নাবাং পাড়া (ফল ব্যবসায়ী), গুইমারা;  ৩১.গিয়াস (মুদি দোকানদার), গুইমারা বাজার; ৩২. তারেক, পিতার নাম মোমিন সওদাগর (মুদি দোকানদার), গুইমারা বাজার; ৩৩. বাবলু বড়ুয়া, পিতার নাম সুদত্ত বড়ুয়া (ক্রোকারিজের দোকানদার), গুইমারা বাজার; ৩৪. মিদুল বড়ুয়া (মুদি দোকানদার), গুইমারা;  ৩৫. শহিদুল, মুসলিম পাড়া (গাছ ব্যবসায়ী), গুইমারা; ৩৬. ডা. ছোটন (ফার্মেসি দোকানদার), গুইমারা বাজার; ৩৭. দ্বীন ইসলাম,মালিক নাজমা হোটেল, গুইমারা বাজার, খাগড়াছড়ি।

সেনাবাহিনীই হামলার মূল হোতা

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা, সোস্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত ভিডিও এবং মানবাধিকার কর্মীদের ভাষ্যে এটা স্পষ্ট যে সেনাবাহিনী ও অবৈধ বসবাসকারী সেটলাররাই মারমা অধ্যুষিত রামসু বাজারে এ বর্বরোচিত হামলা সংঘটিত করেছে। তাদের সাথে সেনা সৃষ্ট ঠ্যাঙাড়ে সন্ত্রাসীদের একটি সশস্ত্র দলও যোগ দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করেছে সেনাবাহিনী। মূলত গুইমারা রিজিয়নের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল কালাম মো. সামসুদ্দির রানার পরিকল্পনায় এই ঘটনা সংঘটিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশের বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী নূর খান ডয়চে ভেলেকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে হামলার জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে দায়ি করেন। ওই সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, “ওই ঘটনার যে ভিডিও আমরা দেখেছি, তাতে স্পষ্ট যে, গুইমারায় সেনাবাহিনী নির্বিচারে গুলি করেছে। সেনাবাহিনীর সঙ্গে স্থানীয় বাঙালিরাও ছিল।”

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এক নারী অভিযোগ করে বলেন, “সেনাবাহিনী ফাঁকা গুলি কিংবা রাবার বুলেট ছুঁড়তে পারতো। কিন্তু তারা সেটা না করে সরাসরি গুলি ছুঁড়ছে। এটা তারা না করলেই পারতো। আমাদের পাহাড়ি ছেলেদের থামানোর জন্য তাদের অনেক কায়দা ছিল। প্রয়োজনে টিয়ার গ্যাস ছুঁড়তে পারতো। তারা তো সেটা করেনি। তারা সরাসরি গুলি করবে কেন?”

তিনি বলেন, “গুলি এসেছে রাস্তার দিক থেকে। আমাদের পাহাড়ি ছেলেরা এদিক থেকে আসলেও তাদের কোন অস্ত্র ছিল না। তাদের হাতে ইট বা লাঠিসোটা ছিল। গুলি এসেছে মেইন রাস্তার দিক থেকে। তারা নির্বিচারে গুলি ছুঁড়েছে, গুলিতে লাশ পড়েছে, মেয়েদের গায়ে পর্যন্ত গুলি লেগেছে। তারা এতই এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়েছে বলার মতো না। আমরা একাত্তরের যুদ্ধের কথা শুধু শুনেছি বা টিভিতে ফিল্মে দেখেছি। এখন আমি বাস্তবে দেখলাম। এটাকে একাত্তরের যুদ্ধের থেকে কী কম মনে হয় আপনাদের?”

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ১৯ সেকেন্ডের আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, সেটলাররা লাঠিসোটা ও ধারালো অস্ত্র হাতে সেনাবাহিনীর সাথে থেকে “আল্লাহু আকবর, নারায়ে তাকবির” ধ্বনি দিচ্ছে, আর সেনাবাহিনী ব্রাশ ফায়ার করছে। সেনাবাহিনীর ব্রাশফায়ারের সাথে সাথে সেটলাররা ”আল্লাহু আকবর” ধ্বনি দিয়ে তাদের সমর্থন জানাচ্ছে। এই সংক্ষিপ্ত ভিডিও ফুটেজই হামলার প্রকৃত চিত্র বলে দেয়।

হামলার উদ্দেশ্য ছিল রামেসু বাজারকে ধ্বংস করে দেওয়া

গুইমারা বাজারের একেবারে কাছে হওয়ায় রামেসু বাজারটি অনেক বাঙালি ব্যবসায়ীর ঈর্ষার কারণ হয়ে উঠেছিল। এই বর্ধিঞ্চু বাজারটিকে তারা প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করত। কারণ আশেপাশের অনেক পাহাড়ি গ্রামের লোকজন তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস এই বাজার থেকে সংগ্রহ করতে পারত। তাদের গুইমারা বাজারে যাওয়া লাগত না।

অপরদিকে গুইমারা সেনা ব্রিগেডের একেবারে কাছে পাহাড়িদের একটি বাজারকে সেনারা ভালো চোখে দেখত না। তারা “নিরাপত্তার” কারণে তাদের ক্যাম্পের চারপাশে কেবল বাঙালিদের বসতি রাখতে চায়। এ কারণে রামেসু বাজারটি এক শ্রেণির ব্যবসায়ী ও সেনাদের চক্ষুশূল হয়ে দাঁড়ায়। তারা মারমা অধ্যুষিত এই বাজারটি ধ্বংস করে দেয়ার জন্য ষড়যন্ত্র শুরু করে। ২৮ সেপ্টেম্বর সড়ক অবরোধের দিনটিকে তারা হামলার মোক্ষম সময় বলে ধরে নেয়।

রামেসু বাজারকে টার্গেট করার উদ্দেশ্য হলো: প্রথমত, গুইমারায় উঠতি মারমা ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়া। দুই, রামেসু বাজারকে গুইমারা বাজারের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠাকে রোধ করা। তিন, রামেসু বাজার ও তার আশেপাশের এলাকা থেকে মারমাদের উচ্ছেদ করে তাদের জমিজমা দখল করা এবং এভাবে এলাকাটিকে একটি বাঙালি মুসলিম সেটলার অধ্যুষিত এলাকায় পরিণত করা।

ঘটনা সম্পর্কে আইএসপিআরের মিথ্যাচার, সংবাদ মাধ্যমের নেতিবাচক ভূমিকা

হামলার ঘটনায় সরাসরি সেনাবাহিনী জড়িত থাকলেও ঐদিন রাতে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) সংবাদ মাধ্যমে মিথ্যাচার করে একটি বিবৃতি দেয়। বিবৃতিতে তারা ঘটনাটিকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে হামলায় গুইমারা ব্রিগেডের সেনাদের দায় স্খলন করার চেষ্টা চালায়। তারা নিজেদের কৃত অপরাধ আড়াল করতে তাদের বিবৃতিতে কল্প কাহিনী ফেঁদে বসে, যা প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের ভাষ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত।

অপরদিকে সমানতালে দেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোও (গুটিকয় বাদে) আইএসপিআরের সাথে পাল্লা দিয়ে হামলার প্রকৃত তথ্য পরিবেশন না করে ঘটনাটি বিকৃতভাবে প্রচার করে। ফলে দেশবাসী গুইমারার হামলা সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানতে পারেনি।

তবে, আইএসপিআরের মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে ইউপিডিএফের পাল্টা বিবৃতিতে বলা হয়, “বাংলাদেশ সেনাবাহিনী খাগড়াছড়ি ও গুইমারা হামলা সম্পর্কে দেশবাসীকে যেভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালিয়েছে, তাতে পাহাড়ের চলমান পরিস্থিতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং হামলাকারীদের উৎসাহিত করবে।”

মানবাধিকার কর্মী ও নারী নেত্রী খুশী কবির আইএসপিআরের বিবৃতিকে একপাক্ষিক বলে মন্তব্য করেন। ডয়েচে ভেলেকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে ১ অক্টোবর ২০২৫ তিনি বলেন, ‘এ ঘটনায় আইএসপিআর যে বিবৃতি দিয়েছে তা পুরোটাই এক তরফা। এটা তো আদিবাসীদের মধ্যে আরো বেশি আস্থাহীনতা তৈরি করলো।”

খাগড়াছড়ি জুম্ম শিক্ষার্থীবৃন্দও এক বিবৃতিতে আইএসপিআরের বিবৃতিকে “মিথ্যাচার” আখ্যায়িত করে প্রত্যাখ্যান করে।

হামলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ

গুইমারা রামেসু বাজাারে হামলা, গুলি করে হত্যা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের প্রতিবাদে চট্টগ্রাম, ঢাকা, রাজশাহী, কাউখালী ও বান্দরবানসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়। এছাড়া দেশের বাইরে দক্ষিণ কোরিয়া, জেনেভা ও ফ্রান্সে প্রবাসী সংগঠনগুলো বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।

দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠন, মানবাধিকার সংগঠন ও ব্যক্তি এবং শিক্ষার্থীরা হামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবি জানিয়ে বিবৃতি প্রদান করে।

হামলা পরবর্তী স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারের ভূমিকা

ঘটনার পরদিন অর্থাৎ ২৯ সেপ্টেম্বর রাজধানীর পুরাতন রমনা থানা চত্বরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, ‘একটি মহল খাগড়াছড়িতে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে। ভারত বা ফ্যাসিস্টদের ইন্ধনে এ ঘটনা ঘটছে।’ (সূত্র: প্রথম আলো)

৩০ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক এ বি এম ইফতেখারুল ইসলাম খন্দকার, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরাসহ জেলা প্রশাসনের একটি টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং সেখানে তারা ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেন। যদিও অনেকে তাদের দেয়া ত্রাণ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান।

সেদিন জেলা প্রশাসক ঘটনা তদন্তে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জনালেও কমিটি গঠন করা হয়েছে কিনা তা আর জানা যায়নি এবং ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্তুও করা হয়নি।

তবে ইউপিডিএফ জেলা প্রশাসনের ঘোষিত তদন্ত কমিটি প্রত্যাখ্যান করে জাতিসংঘকে যুক্ত করে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানায়।

অপরদিকে, ঘটনার পরবর্তী সময়ে গুইমারা থানায় পুলিশ অজ্ঞাত ২৫০ থেকে ৩০০ জনকে অভিযুক্ত করে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করে। কিন্তু ঘটনার এক বছরেও হামলা-অগ্নিসংযোগ ও হত্যাকাণ্ডে জড়িত সেনা-সেটলারদের আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি। উল্টো সেনাবাহিনী নিজেদের কৃত অপরাধ ঢাকতে এখনো নানা ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। 

হামলা-হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে ইউপিডিএফের প্রকাশ করা একটি রিপোর্টে ভবিষ্যতে হামলা রোধে ৭ দফা সুপারিশ পেশ করা হয়েছিল। সুপারিশগুলো হলো:

১। অবিলম্বে হামলাকারী সেনা-সেটলারদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং হামলায় নিহতদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদান, আহতদের (গুইমারা ও খাগড়াছড়িতে) সুচিকিৎসা ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও ব্যবসায়ীদের উপযুক্ত ক্ষতিপুরণ প্রদানসহ স্ব স্ব স্থানে পুনর্বাসন করা।

২। উগ্রসাম্প্রদায়িক সেটলারদেরকে সেনাবাহিনীর মদতদান বন্ধ করা এবং সেটলারদেরকে সম্মানজনকভাবে সমতলে পুনর্বাসনের উদ্যোগ গ্রহণ করা।

৩। পার্বত্য চট্টগ্রামে পূর্ববর্তী ফ্যাসিস্ট সরকারগুলোর চালু করা পাহাড়ি বিদ্বেষী রাষ্ট্রীয় নীতি বাতিল করা।

৪। গুইমারা হামলার পরবর্তী যেভাবে মিথ্যা, বানোয়াট সংবাদ প্রচারের মাধ্যমে ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টা চলছে তা অতি দ্রুত বন্ধ করা।

৫। সাম্প্রদায়িক হামলা ও হত্যার সাথে জড়িত সেনা সদস্যদের শাস্তি প্রদান করা এবং হামলা থেকে পাহাড়িদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য খাগড়াছড়ি রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান মাহমুদ ও গুইমারা রিজিয়নের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সামসুদ্দিন রানাকে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে প্রত্যাহার করা।

৬। জাতিসংঘকে জড়িত করে হামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের উদ্যোগ গ্রহণ করা।

৭। পার্বত্য চট্টগ্রামে চলমান সেনাশাসন ‘অপারেশন উত্তরণ” তুলে নিয়ে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা।

এক বছরেও বর্বরোচিত এই বর্বরোচিত হামলার ঘটনায় সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত, জড়িতদের গ্রেফতার ও বিচার না হওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে আরে দীর্ঘায়িত করেছে বলে মন্তব্য করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে এই বিচারহীনতার অবসান হওয়া অত্যন্ত জরুরি। দীর্ঘ যুগ যুগ ধরে এ ধরনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলতে পারে না। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পরবর্তী থেকে এ যাবত পাহাড়িদের ওপর সংঘটিত গণহত্যা, সাম্প্রদায়িক হামলার কোনো বিচার না হওয়ার ফলে পাহাড়ি জনগণ দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছে।

তারা বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারকে কালক্ষেপণ না করে গুইমারা রামেসু বাজারে সংঘটিত হামলা ও হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচারের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।



This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More