বাংলাদেশের শাসকশ্রেণির শুভবুদ্ধির উদয় হোক!

0


লেখা: মাইকেল চাকমা



ইউপিডিএফকে ঘিরে নতুন করে বহুমাত্রিক ষড়যন্ত্রে নেমেছে সেনাবাহিনী ও সামরিক গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই)। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক আন্দোলনের পরিসর সংকুচিত করে সংগঠনটির বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান সামরিক দমন-পীড়নের পথ বেছে নিয়েছে রাষ্ট্র। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, বেআইনি ধরপাকড় ও হয়রানির পাশাপাশি ইউপিডিএফকে লক্ষ্য করে পরিকল্পিত ও কাঠামোগত অপপ্রচারের মাত্রাও সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রায়ই তথাকথিত অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের নাটক মঞ্চস্থ করে ইউপিডিএফকে জড়িয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। এর সর্বশেষ নজির দেখা গেছে ১ জুলাই বান্দরবান রাঙাগামাটি সীমান্তবর্তী রেতলাং এলকায় কেএনএফের বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক অভিযানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে।

উক্ত অভিযানে সেনাবাহিনীর মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতির খবর বিভিন্ন সূত্রে প্রচারিত হলেও, ঘটনার প্রায় দুই দিন পর ঘটনার বিস্তারিত কোন তথ্য না দিয়ে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) ও বাংলাদেশ আর্মি তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে অভিন্ন বিবৃতি প্রকাশ করেছে। বিবৃতিতে কোন উপযুক্ত প্রামণ ব্যতিরেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ইউপিডিএফকে ঘটনার সঙ্গে জড়ানোর অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। এটি তাদের একটি পুরোনো কৌশল এবং দীর্ঘদিন ধরে ইউপিডিএফের বিরুদ্ধে পরিচালিত পরিকল্পিত অপপ্রচার, জনমত প্রভাবিতকরণ ও রাজনৈতিক চরিত্রহননের ধারাবাহিক প্রচেষ্টারই অংশ। এ ধরনের অসত্য বক্তব্য কেবল দেশের সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।

শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রীয় মদদে গড়ে ওঠা প্রতিপক্ষ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সর্বাত্মক সহায়তা প্রদান এবং তাদের সঙ্গে নিয়ে ইউপিডিএফের বিরুদ্ধে সমন্বিতভাবে আক্রমণ পরিচালনার ঘটনাও আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই আরও জটিল ও অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে।

এমন প্রেক্ষাপটে পাহাড়ের রাজনীতির গতিপথ নতুন মোড় নিতে পারে বলে পার্বত্য চট্টগ্রামজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও জল্পনা-কল্পনা চলছে। দীর্ঘদিন ধরে যারা পাহাড়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা পর্যবেক্ষণ করে আসছেন, তাঁদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতি দেশের প্রচলিত রাজনৈতিক ধারার তুলনায় স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠী ও সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘকাল ধরে যে দখলদারিত্বমূলক, বিপজ্জনক ও ভ্রান্ত নীতি-কৌশল অনুসরণ করে আসছে, তা শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে অঞ্চলটিকে আরও অশান্ত, বিক্ষুব্ধ ও বিদ্রোহপ্রবণ করে তুলছে।

এর মধ্যে সরকার সবচেয়ে বড় যে ভুলটি করে আসছে, তা হলো পার্বত্য চট্টগ্রামকে সেনাবাহিনীর হাতে ইজারা দিয়ে রাখা এবং অঞ্চলটিকে একপ্রকার অঘোষিত অঙ্গরাজ্যে পরিণত করে সামরিক শাসকদের মাধ্যমে পরিচালনা করা। ফলে তিন পার্বত্য জেলা রাষ্ট্রের সার্বভৌম সীমানা ও সাংবিধানিক কাঠামোর অংশ হওয়া সত্ত্বেও কার্যত এর ওপর সরকারের বেসামরিক প্রশাসনের কর্তৃত্ব নেই বললেই চলে। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, স্থানীয় প্রশাসন পরিচালনা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ- সবকিছুতেই সামরিক বাহিনীর গভীর প্রভাব সুস্পষ্ট। এক অর্থে, পার্বত্য অঞ্চলকে কেন্দ্র করে শাসকশ্রেণি রাষ্ট্রের ভেতরে একটি অঘোষিত সমান্তরাল রাষ্ট্রব্যবস্থা কার্যকর করে রেখেছে।

এই বাস্তবতার কারণে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের পক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সামরিক কর্তৃপক্ষের মতামত ও অবস্থানকে উপেক্ষা করা সম্ভব হয় না। এ বিষয়ে একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ পাওয়া যায় অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার ২০২৫ সালের ২১ আগস্ট যমুনা টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে। সেখানে তিনি উপদেষ্টা নিয়োগের প্রসঙ্গে বলেন— “শুধু একটা নাম আমরা রেখেছিলাম, সিএইচটি উপদেষ্টা যিনি আছেন; কারণ আমার কাছে মনে হচ্ছে, ওইটা সেনসিটিভ জায়গা এবং দেশের টার্ম অব ট্রানজিশনাল সিচুয়েশনে, যেহেতু আর্মি পুরোপুরি আমাদের পার্বত্য অঞ্চলের সমস্যাগুলো ডিল করে, তো সেখানে তাদের কথাটা রাখা উচিত।”

এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সামরিক প্রতিষ্ঠানের প্রভাব কতটা গভীর।

এ কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা যায় যে, পার্বত্য চট্টগ্রামকে সেনাশাসনের কবল থেকে মুক্ত করে প্রকৃত গণতান্ত্রিক শাসনকাঠামোর আওতায় ফিরিয়ে আনা না গেলে পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠবে। একটি অঞ্চলের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান সামরিক বলপ্রয়োগ বা সামরিক শাসনের মাধ্যমে সম্ভব নয়- এই সরল সত্য সরকারকে মেনে নিতে হবে। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, এ ধরনের ভ্রান্ত, উগ্র ও দমনমূলক সামরিক নীতি দীর্ঘমেয়াদে সংকটের সমাধানের পরিবর্তে তাকে আরও তীব্রতর করে তোলে। এই বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে যত বিলম্ব হবে, পাহাড়ের সমস্যাও তত বেশি জটিল থেকে জটিলতর রূপ ধারণ করবে। তাই সময় থাকতে যদি শাসকশ্রেণির বোধোদয় না হয় এবং তারা বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়, তবে তা হবে অত্যন্ত দুঃখজনক।

অতএব, বাংলাদেশের শাসকশ্রেণির শুভবুদ্ধির উদয় হোক।

* লেখাটি মাইকেল চাকমার ফেসবুক থেকে সংগৃহিত।



This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More