মতামত

ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত: ইউপিডিএফ কী চায়

0


অংগ্য মারমা, সংগঠক, ইউপিডিএফ



১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির পর গত ২৮ বছর ধরে ইউপিডিএফ ও সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএসের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত চলে আসছে। মূলত বাংলাদেশ সরকার ও জনসংহতি সমিতি জনগণের ওপর এই সংঘাত চাপিয়ে দিয়েছে। উদ্দেশ্য হলো জনসংহতি সমিতি ও তার সশস্ত্র সংগঠন শান্তিবাহিনীর আত্মসমর্পনের পর যাতে পার্বত্য চট্টগ্রামে নতুন করে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলন গড়ে উঠতে না পারে।

ইউপিডিএফ ও তার সহযোগি সংগঠনগুলো শুরু থেকেই এই সংঘাতের বিরোধীতা করে আসছে। কারণ এই সংঘাত জনগণের স্বার্থের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তাই তারা বার বার সংঘাত এড়িয়ে যেতে ও বন্ধ করতে চেয়েছে। ইউপিডিএফ চেয়েছে এবং এখনও চায়, জনগণের সকল শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে আন্দোলন গড়ে তোলা। এই লক্ষ্যে ইউপিডিএফ জেএসএসের কাছে বার বার সংলাপ, ঐক্য ও সমঝোতার আহ্বান জানিয়েছে। পোস্টার ছাপিয়ে, ইউপিডিএফের মুখপত্র স্বাধিকারে এবং বিভিন্ন বক্তব্য বিবৃতিতে এই আহ্বান জানানো হয়েছে।

যেমন, ২০০১ সালের ১ জানুয়ারি স্বাধিকারে প্রকাশিত একটি আহ্বান হলো: জনসংহতি সমিতির প্রতি ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট-এর তিন দফা ঐক্য প্রস্তাব: ১) অচিরেই ইউপিডিএফ ও জনগণের ওপর আক্রমণ বন্ধ করা; ২) সরকারের বিরুদ্ধে ন্যুনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলা; এবং ৩) ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের লক্ষ্যে ইউপিডিএফ ও জেএসএস-সহ পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল দেশপ্রেমিক শক্তিসমূহের সমন্বয়ে ‘জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট’ গড়ে তোলা। (স্বাধিকার, বুলেটিন নং ১৭)

উল্লেখ্য, উপেন্দ্র লাল চাকমাসহ তিন জেলার সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও দুই পার্টির মধ্যে ঐক্য ও সমঝোতার চেষ্টা চালিয়েছিলেন। UNPO বা আনরিপ্রেজেন্টেড নেশনস এন্ড পিপলস অরগানাইজেশন নামের একটি আন্তর্জাতিক সংগঠনও উভয় দলের মধ্যে সংলাপের উদ্যোগ নিয়েছিল। এই সংগঠনের একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি ১৯৯৮ সালে ইউপিডিএফ ও জেএসএসকে আলোচনায় বসানোর জন্য সুদূর ইউরোপ থেকে দু’বার ঢাকা ও রাঙ্গামাটি সফর করেছিলেন। কিন্তু জেএসএস নেতৃত্ব ইউএনপিও প্রতিনিধির কাছে সংলাপে বসার প্রতিশ্রুতি দিলেও শেষে তারা তাদের সেই কথা রাখেনি। ইউএনপিওর কাছে এটা ছিল জেএসএসের একটি বড় ধরনের প্রতারণা।

অথচ তখন যদি জেএসএস সুশীল সমাজ ও ইউএনপিওর মধ্যস্থতায় আলোচনায় বসে ইউপিডিএফের ঐক্যের প্রস্তাবে রাজী হতো এবং দুই পার্টির নেতৃত্বে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে আন্দোলন গড়ে তোলা হতো, তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি আজ অন্য রকম হতো। সরকার কেবল চুক্তি বাস্তবায়ন নয়, জনগণের অধিকারের প্রশ্নে আরও অনেক বড় ছাড় দিতে বাধ্য হতো। পাহাড়ে শান্তি ফিরে আসতো এবং পাহাড়ি জনগণ শিক্ষা, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিকভাবে অনেক উন্নতি লাভ করতে পারতো।

কিন্তু জেএসএস (সন্তু) ঐক্য ও সমঝোতার পথ বেছে নেয়নি। তারা সরকারের সাথে মিলে ইউপিডিএফ নির্মূলের কর্মসূচি গ্রহণ করে। ফলে জাতির শত শত শ্রেষ্ঠ সন্তান এই সংঘাতে বলি হয় এবং জাতীয় অস্তিত্বের সংকট তীব্রতর হয়। ইউপিডিএফ ও জনগণের চাপ ও প্রতিরোধের কারণে জেএসএস দুর্বল ও কোণঠাসা হয়ে পড়লে ইউপিডিএফের সাথে চার বার সমঝোতা করতে বাধ্য হয় সত্য। কিন্তু নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করার পর তারা সেই সমঝোতা লঙ্ঘন করে। ফলে আবার নতুন করে সংঘাত সৃষ্টি হয় এবং ইউপিডিএফ আবার জেএসএসের চাপিয়ে দেয়া সংঘাত মোকাবিলা করতে বাধ্য হয়।

সরকার ও জেএসএসের অনেক চেষ্টা সত্বেও গত ২৮ বছরে ইউপিডিএফ ধ্বংস হয়নি, বরং শূন্য থেকে শুরু করে পার্টি আজ অনেক বেশি শক্তি অর্জন করেছে। অপরদিকে এই সময়ে জেএসএস ভেঙে দু’ টুকরো হয়ে গেছে এবং অনেক পুরোনো ও অভিজ্ঞ নেতাকর্মীরা দলত্যাগ করেছে অথবা নিষ্ক্রিয় হয়েছে। ফলে জেএসএস অনেক বেশী দুর্বল ও কঙ্কালসার হয়ে পড়েছে। বর্তমানে জেএসএস সন্তু গ্রুপের অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, তারা সেনাবাহিনীর সাহায্য ও সমর্থন ছাড়া টিকে থাকতে পারছে না।

এটা জানা দরকার, সন্তু লারমার জেএসএস ইউপিডিএফকে নির্মূল করতে চাইলেও, ইউপিডিএফের লক্ষ্য কখনই জেএসএসকে ধ্বংস করা নয়। ইউপিডিএফ চায় জেএসএসকে সাথে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন গড়ে তোলা।

২৮ বছর পরও জেএসএস সন্তু গ্রুপ তাদের ভুল নীতি পরিত্যাগ করেনি। এখনও তারা ইউপিডিএফকে নির্মূল করতে চায়। তারা জনগণের আকাঙক্ষা ও দাবি ঐক্য-সমঝোতার বিরোধী। তাদের এই অবস্থানের কথা তারা রাকঢাক না করে নেত্র নিউজকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে। অপরদিকে ঐক্য, সমঝোতা ও আন্দোলন প্রশ্নে ইউপিডিএফ তার আগের অবস্থানেই রয়েছে।

বলা বাহুল্য, জেএসএস সন্তু গ্রুপের ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার নীতি ও কর্মসূচি হলো জাতীয় স্বার্থ বিরোধী এবং জনগণের শত্রুদের জন্য লাভজনক। অন্যদিকে ইউপিডিএফের ঐক্য ও সমঝোতার নীতি, দুই পার্টির নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের প্রস্তাব জনগণের স্বার্থের পক্ষে।

ইতিহাসে এটা বার বার প্রমাণিত হয়েছে, জাতীয় স্বার্থ বিরোধী, গণবিরোধী কোন কর্মসূচি কখনই সফল হয় না। যে দল বা সংগঠন এমন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে চায়, তারা অবশেষে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। জেএসএস সন্তু গ্রুপও তাদের গণবিরোধী, জাতীয় স্বার্থ বিরোধী কর্মসূচি নিয়ে ধ্বংসের পথে অগ্রসর হচ্ছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তাদেরকে এই ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে না, যদি না তারা তাদের নীতি ও কর্মসূচি দ্রুত পরিবর্তন না করে। (সমাপ্ত)

২১ জুলাই ২০২৬



This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More