রূপন, সমর, সুকেশ ও মনতোষ’র শহীদ-গুম হওয়ার ৩০ বছর

বিশেষ প্রতিবেদন, সিএইচটি নিউজি
শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬
আজ ২৭ জুন ২০২৬ রূপন, সমর, সুকেশ ও মনতোষ চাকমার শহীদ ও গুম হয়ে নিখোঁজ হওয়ার ৩০ বছর পূর্ণ হলো। ১৯৯৬ সালের এই দিনে সেনা কমাণ্ডার লে. ফেরদৌস ও তার সহযোগীদের দ্বারা অপহৃত হিল উইমেন্স ফেডারেশনের নেত্রী কল্পনা চাকমাকে উদ্ধারের দাবিতে বাঘাইছড়িতে সড়ক ও নৌপথ অবরোধ পালন করতে গিয়ে তৎকালীন ১০ম শ্রেণির ছাত্র রূপন চাকমা আনসার-ভিডিপির গুলিতে শহীদ হন এবং সমর, সুকেশ ও মনতোষ সেটলারদের হামলার শিকার হয়ে গুমের শিকার হন।
কল্পনা চাকমা অপহৃত হন ১৯৯৬ সালের ১১ জুন দিবাগত রাত ১:০০টায় (অর্থাৎ ১২ জুন) ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক ৭ ঘন্টা আগে। বাঘাইছড়ি উপজেলার নিউ লাল্যাঘোনা গ্রামের নিজ নিজ বাড়ি থেকে তাকে অপহরণ করা হয়। তখন দেশের ক্ষমতা ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। এ ঘটনায় দেশে-বিদেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। পাহাড় থেকে সমতল সর্বত্র মানুষ কল্পনা চাকমাকে অপহরণের প্রতিবাদে সোচ্চার হয়।
এ অপহরণ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী পরিবারের সদস্যরা অপহরণকারীদের মধ্যে তৎকালীন কজইছড়ি আর্মি ক্যাম্পের কমান্ডার ১৭ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের লে. ফেরদৌস ও ভিডিপির নুরুল হক ও সালেহ আহম্মদকে চিনতে পারেন।
উক্ত অপহরণ ঘটনার প্রতিবাদে এবং অপহৃত কল্পনা চাকমাকে দ্রুত উদ্ধার ও চিহ্নিত অপহরণকারীদের গ্রেফতারের দাবিতে পাহাড়ি গণ পরিষদ, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন ২৭ জুন’ ৯৬ তিন পার্বত্য জেলায় অবরোধ কর্মসূচির ডাক দেয়। বাঘাইছড়িতেও সর্বাত্মক সড়ক ও নৌপথ অবরোধ কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। সেদিন অবরোধ কর্মসূচি সফল করতে আরও অনেকের সাথে খেদারমারা গ্রামের সুকেশ চাকমা (১৬) ও সমর বিজয় চাকমা, বঙ্গলতলী গ্রামের মনতোষ চাকমা (২২) ও রূপকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির ছাত্র রূপন চাকমা (১৬) রাজপথে নেমে পড়েন।
এদিকে, অবরোধ কর্মসূচি বানচাল করে দিতে প্রশাসন গোপন চক্রান্ত চালাতে থাকে। কর্মসূচি প্রতিহত করতে তৎপর করা হয়েছিল পুলিশ, আনসার-ভিডিপিসহ সামরিক বাহিনীর সদস্যদের, আরও সক্রিয় করা হয়েছিল বাঙালি সেটলারদের।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনাতে জানা যায়, সেদিন সকাল থেকে যথারীতি অবরোধ কর্মসূচি শুরু করা হয়। অবরোধ চলাকালে এক পর্যায়ে সেটলাররা বিনা উস্কানিতে অবরোধ পালনকারী ছাত্র-জনতার উপর হামলা চালায়। এতে ব্যাপক ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে জনৈক ভিডিপি সদস্য (সেটলার) পুলিশের কাছ থেকে রাইফেল কেড়ে নিয়ে অবরোধ পালনকারী ছাত্র-জনতার উপর গুলি ছোঁড়ে। এতে রূপন চাকমা ঘটনাস্থলেই শহীদ হন।
তখনকার সময়ে পত্রিকায় খবর এসেছিল…“কর্তব্যরত জনৈক পুলিশের হাত থেকে রাইফেল ছিনিয়ে নিয়ে গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্লাটুন কমান্ডার নুরুল ইসলাম গুলি চালায়। সে গুলিতে রূপকারী বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্র রূপন চাকমা গুলিবিদ্ধ হয়” (সংবাদ, ৭ জুলাই ১৯৯৬)…

পরে পুলিশ ও সেটলাররা ফায়ার করতে করতে ছাত্র-জনতার দিকে এগিয়ে যায় এবং শহীদ রূপন চাকমার লাশটি তাদের হেফাজতে নিয়ে যায়। তারা রূপন চাকমার লাশটি আর ফেরত দেয়নি।
শহীদ রূপন চাকমা সম্পর্কে একজনের স্মৃতিচারণ “…তাদের [ছাত্র-জনতার] হাতে তখন কোনো আগ্নেয়াস্ত্র ছিল না। ছিল শুধু কান্তা বা গুলতি এবং ট্র্যাডিশাল বাদোল। আর দা ও লাঠিসোটা। এভাবে সেটলার বাঙালিরা গুলি করতে করতে আমাদের গ্রামের এক অংশে প্রবেশ করল। কিন্তু আর এগুতে পারল না তারা। ঠিক তা না। প্রতিরোধক হয়ে দাঁড়ালেন শহীদ রূপন দা। তার হাতে থাকা কান্তাটা গুলতি ছুঁড়তে ছুঁড়তে ছিঁড়ে গিয়েছিল। তাই আর গুলতি চালাতে পারেননি। যেসময় অন্য পাহাড়ি ভাইয়েরা অধিকাংশ প্রাণ বাচাঁতে পিছু হটছে এবং সেটলাররা যখন বন্দুক উচিয়ে একের পর এক ঝাঁক দেখে দেখে তাক করে গুলি ছুঁড়ছে এবং পাহাড়িরা গ্রাম রক্ষা করার কথা বাদ দিয়ে বরং প্রাণরক্ষা ফরজ হয়ে দাড়িয়েছে, ঠিক সেই সময় ঐ বন্দুকধারী সেটলার জানোয়ারটার দৃষ্টি ডাইভার্ট করে দিয়ে দুই উঁচু জায়গার মাঝখানে জমির ওপর দাঁড়িয়ে থেকে বলিষ্ট কন্ঠে চিৎকার করে বুক উঁচিয়ে একাই প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছিলেন, “সেদাম থেলে মরে মার”(হিম্মত থাকলে আমাকে গুলি করো)। না, দু-একটা গুলি করেও টার্গেট করতে পারেনি ঐ হায়েনাটা। আরেকজন সেটলার হায়েনা যাকে ট্রেনিং প্রাপ্ত কোন আনসার/ভিডিপি সদস্য মনে হয়েছিল সে বন্দুকটা আগেরজন থেকে কেড়ে নিয়ে গুলি চালালে শহীদ রূপনদা পেছন দিকে ছিটকে না পরে বীরবেশে সামনে ঢলে পড়েন এবং কিছুক্ষণের মধ্যে শাহাদাত বরন করেছিলেন।” (সূত্র: ঠোঁটকাটা ডটকম)
অপরদিকে, সমর বিজয়, মনতোষ ও সুকেশ চাকমা পিকেটিং-এ অংশগ্রহণের জন্য রূপকারী থেকে মারিশ্যা বাজারের দিকে যাওয়ার পথে মুসলিম ব্লক নামক স্থানে পৌঁছলে সেটলারদের আক্রমণের শিকার হন। সেটলাররা তাদেরকে ধাওয়া দিয়ে ধরে নিয়ে গুম করে ফেলে। সেই থেকে আজ পর্যন্ত তাদের কোন খোঁজ মিলেনি।
দীর্ঘ ৩০ বছরেও কল্পনা চাকমা অপহরণের বিচার যেমনি হয়নি, একইভাবে রূপন, সমর, সুকেশ ও মনোতোষ চাকমাকে হত্যা-গুমের বিচারও আজো হয়নি। এ রাষ্ট্র বা সরকার হয়তো এ ঘটনাগুলোর বিচার কোনদিন করবে না। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ এসব ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা না হওয়া পর্যন্ত লড়েই যাবে।
শাসকগোষ্ঠী কল্পনা, রূপন, সমর, সুকেশ, মনতোষদের অপহরণ, খুন, গুম করে পরিবার ও সমাজের বুক থেকে হারিয়ে দিলেও তারা অমর অক্ষয় হয়ে থাকবেন পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে।
সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ,ভিডিও, কনটেন্ট ব্যবহার করতে হলে কপিরাইট আইন অনুসরণ করে ব্যবহার করুন।
