সাজেকে পাহাড়িদের ওপর প্রথম সাম্প্রদায়িক হামলার ১৮ বছর আজ

0
ফাইল ছবি

ডেস্ক রিপোর্ট, সিএইচটি নিউজ
সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬

বিগত ২০০৮ সালের ২০ এপ্রিল দেশে জরুরী অবস্থার সময় রাঙামাটির জেলার সাজেক ইউনিয়নে ৪টি পাহাড়ি গ্রামে সেনা-সেটলারদের পরিকল্পিত হামলায় ৭৭টি বসতবাড়ি, ১টি গীর্জা ও ২টি ইউনিসেফ পরিচালিত পাড়া কেন্দ্র পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। হামলায় নেতৃত্ত্ব দেয় বাঘাইছড়ি জোন কমান্ডার লে. কর্নেল সাজিদ মো. ইমতিয়াজ, মেজর হাফিজ ও বাঘাইহাট বাজারের ব্যবসায়ী গোলাম মওলা। বাড়ি ঘরে আগুন দেয়ার আগে ব্যাপক লুটপাট চালানো হয়। আহত হয় তিন জন। দীর্ঘ ১৮ বছরেও এই হামলার ঘটনার কোন বিচার হয়নি।

সে সময় ঘটনা ধামাচাপা দিতে বাঘাইহাট জোনের সেনা সদস্যরা ব্যাপক তৎপরতা চালায়। সাংবাদিক ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিদেরকে উক্ত এলাকা সফর করতে বাধা দেওয়া হয় অথবা তাদের তত্ত্বাবধানে তাদেরই নির্ধারিত স্থানে কেবল যেতে দেওয়া হয়। লোকজনের সাথে খোলামেলাভাবে কথা বলতে দেওয়া হয়নি।

এ অবস্থায় সাজেক হামলার প্রকৃত চিত্র দেশবাসীর কাছে তুলে ধরতে কয়েকজন ভুক্তভোগী ঢাকায় গিয়ে ২৭ এপ্রিল ২০০৮ বিকেল সাড়ে তিনটায় ঢাকার সেগুন বাগানস্থ রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন করেন। এতে তারা ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন।

২০ এপ্রিলের হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাকে পূর্বপরিকল্পিত আখ্যায়িত করে সংবাদ সম্মেলনে তারা বলেন, “ঘটনার আগে দীঘিনালার মেরুং ও করাখালি এবং রাঙামাটি জেলার মারিশ্যা ও লংগুদু থেকে সেটলার এনে জড়ো করা হয়। ১৯ এপ্রিল তথাকথিত সমঅধিকার আন্দোলনের বাঘাইছড়ি শাখার সভাপতি সেলিম উদ্দীন বাহারী বাঘাইহাট এসে লে. কর্ণেল ইমতিয়াজের সাথে দেখা করেন। তারা এ সময় ২০ তারিখের হামলা সম্পর্কে পরিকল্পনা করেন বলে ধারণা করা হয়। বাঘাইহাটের অনেক সহৃদয় বাঙালি হামলার পরিকল্পনা সম্পর্কে পাহাড়িদেরকে আগাম তথ্য দিয়ে সতর্ক করে দেন। যখন দেশ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য নিয়োজিত বলে দাবিদার সেনাবাহিনী সেটলারদের পক্ষে ও আমাদেরকে জায়গা জমি থেকে উচ্ছেদ করতে তৎপর, যখন এমন কেউ নেই যার কাছে গিয়ে আমরা প্রতিকার ও নিরাপত্তা চাইতে পারি, তখন এমন এক নিদারুণ অসহায় সময়ে আমরা নিজেদের রক্ষার জন্য সংঘবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করি এবং গ্রামে গ্রামে পাহারা দিতে থাকি।

“রাত পৌনে দশটার দিকে আনুমানিক ২০০ জন সেটলার সংঘবদ্ধ হয়ে প্রথমে পাহাড়িদের ডেনো বা ডানে বাইবাছড়া গ্রামের দিকে অগ্রসর হয়। তারা গ্রামে পাহাড়িদেরকে সংঘবদ্ধভাবে দেখতে পেয়ে ফিরে যায়। পরে সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাদেরকে পাহাড়িদের গ্রামে হামলা চালাতে আবার চাপ দেয় এবং আক্রমণের সময় সাহায্যকারী বাহিনী হিসেবে সেটেলারদের পেছনে অবস্থান নেয়। এভাবেই সেটলাররা সেনাবাহিনীর সহায়তায় দ্বিতীয়বার ডানে বাইবাছড়ায় চিৎকার দিতে দিতে হামলা চালায়। তারা প্রথমে নির্মল কান্তি চাকমার বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়। এরপর জ্বালিয়ে দেয় নীহার কান্তি চাকমার বাড়ি। এরপর একে একে পূর্ব পাড়া, রেতকাবা পাড়া ও গঙ্গারামে গিয়ে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গীর্জা এবং ইউনিসেফ এর পাড়া কেন্দ্রও বাদ যায়নি।

“এছাড়া ইউএনডিপি’র আর্থিক সাহায্যে রেতকাবায় ২০০৬ সালের প্রকল্পের আওতায় গড়ে তোলা মিশ্র ফলের বাগানটিও আগুন লাগিয়ে ধ্বংস করে দেয় হামলাকারীরা। এতে লিচু, আনারস, কলা ও কাঁঠাল চারা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। এরপর সেটেলাররা বাগানে বাঘাইহাট জিপ শ্রমিক সমিতির সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেয়।”

সংবাদ সম্মেলনে ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে তারা বলেন, “পাহাড়িদের ৪টি গ্রামের মোট ৭৭টি ঘর পুড়ে যায়। এর মধ্যে পূর্ব পাড়ার ৩৩টি বাড়ির ২৮টি, গঙ্গারাম মুখ গ্রামের ৪৭টি বাড়ির মধ্যে ১১টি, রেতকাবা মুখ পাড়ার ৯৪টি বাড়ির মধ্যে ৫টি ও ডানে বাইবাছড়ার ১০০টি বাড়ির মধ্যে ৩৩টি বাড়ি সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এছাড়া রেতকাবা মুখ পাড়ায় ১টি গীর্জা এবং ডানে বাইবাছড়ায় ইউনিসেফ-এর ২টি পাড়া কেন্দ্রও পুড়িয়ে দেয়া হয়। সব মিলিয়ে আনুমানিক দেড় কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয়ে যায়। আহত হন তিন জন। তারা হলেন নিউটন চাকমা ওরফে কালাবো, বিজয় সিং চাকমা ও রতন বিকাশ চাকমা।“

সংবাদ সম্মেলনে তারা ক্ষতিগ্রস্ত সকল পাহাড়ি পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়া ও তাদেরকে তাদের স্ব স্ব জমিতে পুনর্বাসন করা; হামলা ও অগ্নিসংযোগের প্রধান পরিকল্পনাকারী ও মদদদাতা বাঘাইহাট জোন কমান্ডার লে. কর্ণেল মাজিদ মো. ইমতিয়াজ ও ব্যবসায়ী গোলাম মওলাসহ ঘটনার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের অবিলম্বে কঠোর শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ; বাঘাইহাটে পাহাড়িদের জমিজমা বেদখল ও সেটলার পুনর্বাসন বন্ধ করাসহ ৫ দফা দাবি তুলে ধরেন। (সূত্র: পিতৃভূমি বুলেটিনে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে সংক্ষেপিত)।

উক্ত ঘটনার কোন বিচার না হওয়ায় এর ২ বছর পর ২০১০ সালের ১৯-২০ ফেব্রুয়ারি একইভাবে সাজেকে আরেকটি ভয়াবহ হামলা সংঘটিত হয়েছিল, যাতে লক্ষী বিজয় চাকমা ও বুদ্ধপুদি চাকমা নিহত হয়েছিলেন। জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল ৫ শতাধিক পাহাড়িদের ঘরবাড়ি।

পার্বত্য চট্টগ্রামে এভাবে বিচারহীনতার ফলে সেনাবাহিনীর সহায়তায় সেটলার বাঙালিরা বার বার পাহাড়িদের ওপর হামলা চালিয়ে থাকে।

তাই, সরকারকে সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের ওপর সংঘটিত এসব সাম্প্রদায়িক হামলাগুলোর বিচার নিশ্চিতে অবশ্যই উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত।



This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. AcceptRead More